সমকাল এক্সপ্লেইনার
তাইওয়ান কীভাবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের কেন্দ্র হলো
তাইওয়ান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন চীনের নেতা শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ১৮:২৭ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১২:০৪
তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভুল পদক্ষেপ নিলে চীনের সঙ্গে সংঘাত শুরু হতে পারে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন শি জিনপিং। প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফরের আগে থেকেই তাইওয়ান ইস্যুকে ‘হট টপিক’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার দুই নেতার শীর্ষ সম্মেলন শুরুর মুহূর্তেই সেই উত্তাপ ছড়িয়েছে।
প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের একটি দ্বীপ কেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে? চীনই বা কেন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের পাতা, ভূরাজনৈতিক কৌশল এবং কিছু ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দিতে হবে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় ৩৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটির অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরের সংযোগস্থলে। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটিকে আলাদা করেছে তাইওয়ান প্রণালি। বর্তমানে কাগজে কলমে তাইওয়ান রিপাবলিক অব চায়না (আরওসি) নামে পরিচিত। আর চীন পরিচিত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (পিআরসি) নামে।
একটি গৃহযুদ্ধ, তারপর...
তাইওয়ান প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডে আরওসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে। ওই সময় তাইওয়ান দ্বীপ জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণের পর দ্বীপটিকে আরওসির কাছে হস্তান্তর করে। বিশ্বযুদ্ধ শেষের প্রায় চার বছরের মাথায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আরওসির মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৪৯ সালে আরওসির নেতারা মূল ভূখণ্ড থেকে তাইওয়ান দ্বীপে চলে যান। সেখানে গিয়ে তারা তাইওয়ান দ্বীপ ও আশপাশের কিছু এলাকায় নিজেদের মতো করে শাসন কাঠামো গড়ে তোলেন। যার ফলে তাইওয়ান ও চীন দুটি ভিন্ন সরকারের শাসনাধীনে চলে যায়।
পিআরসি বা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এরপর আর কখনোই তাইওয়ানে সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা করেনি। তবে দ্বীপটিকে নিজেদের অঞ্চল হিসেবেই দেখে আসছে বেইজিং। এখন তারা যেকোনো মূল্যে (বলপ্রয়োগও অন্তর্ভুক্ত) দ্বীপটিকে একত্রীকরণ করতে চায়।
কেন একত্রীকরণের আকাঙ্ক্ষা
বেইজিংয়ের দাবি, ১৯৯২ সালে দুই ভূখণ্ডের নেতারা ‘এক চীনের’ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিলেন। ওই ঐকমত্যের আওতায় উভয় ভূখণ্ডের নেতারা স্বীকার করেন, চীন এখনো একই দেশ আছে। চীনা গণমাধ্যম সিজিটিএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালেও দুই ভূখণ্ডের নেতারা বৈঠক করেন। সেটি ছিল পুনর্মিলন এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।
তাইওয়ান-চীন একত্রীকরণের আকাঙক্ষার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রধান কারণগুলো হলো- তাইওয়ানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীন বিশ্বব্যাপী পরাশক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য সুসংহত করতে চায়। তারা ‘দ্য তাইওয়ান কোয়েশ্চন অ্যান্ড চায়নাস রিইউনিফিকেশন ইন দ্য নিউ এরা’ শিরোনামে একটি ধারণাও প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, চীনকে দমিয়ে রাখতে বিদেশি পরাশক্তির প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ার একমাত্র পথ হলো- তাইওয়ানের একত্রীকরণ।
এখানে তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম, তাইওয়ানের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরে। সেখানে সামরিক ঘাঁটি করতে পারলে চীন নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বিস্তার ঘটাতে পারবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপানের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোও চাপে থাকবে।
‘আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজি’
চীন কেন তাইওয়ানকে একত্রীকরণ করতে চায় তা বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজি’ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। ওয়াশিংটনের এই কৌশলটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগর কেন্দ্রিক। যা তিনটি ধাপে এশিয়ার সীমানা থেকে শুরু হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা পর্যন্ত গেছে।
এই ধাপগুলোর আওতায় আছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। যেমন- ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইনের ভৌগোলিক রেখাটি জাপানের একাংশ, তাইওয়ান ও ফিলিপাইন কেন্দ্রিক। দ্বিতীয় চেইনের মধ্যে আছে জাপানের আরেক অংশ। তৃতীয় চেইনে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা ও দ্বীপ অঙ্গরাজ্য হাওয়াই। আলাস্কার পাশেই বেরিং প্রণালির ওপারে রাশিয়ার ভূখণ্ড শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অ্যাইল্যান্ড চেইন কৌশলের কারণে চীন প্রশান্ত মহাসাগরে বৃহৎ পরিসরে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রথম বাধা হিসেবে আসে তাইওয়ান, জাপানের একাংশ ও ফিলিপাইন নিয়ে গঠিত ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন। এক্ষেত্রে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের সঙ্গে একীভূত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের এই আইল্যান্ড চেইন কৌশল ভেঙে দিতে পারবে।
এ কারণে ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইনকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার সাবেক কূটনীতিক আলফ্রেডো তরো হার্ডি। গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ‘গ্লোবাল পলিসি’। হার্ডি জানান, ফার্স্ট ও সেকেন্ড আইল্যান্ড চেইনের বিপরীতে চীন এ দুটিকে মিলিয়ে ‘টু আইল্যান্ড চেইন’ নীতি গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য দুটি অঞ্চলই মার্কিন প্রভাবমুক্ত রাখা।
যেহেতু চীন ঐতিহাসিকভাবে তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে; তাই মার্কিন আইল্যান্ড চেইন কৌশল ভাঙার প্রচেষ্টায় তাইপের একত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বেইজিং। চলতি বছরের প্রথমদিনও (১ জানুয়ারি) এই অগ্রাধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন শি জিনপিং। তিনি বলেন, তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের পুনরায় একত্রীকরণ অনিবার্য। এটি ঠেকানো সম্ভব না।
সম্প্রতি চীনের এই প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন মিত্র এবং আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজির অন্তর্ভুক্ত দেশ জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান দখলের চেষ্টা হলে টোকিও সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে।’ দেশটি সম্প্রতি মারণাস্ত্র রপ্তানির বাজারেও প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সেমিকন্ডাক্টর ও যুক্তরাষ্ট্র
দশকের পর দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাদের এশীয় ক্ষুদ্র মিত্রকে (তাইওয়ান) চীনের হাত থেকে রক্ষায় কাজ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে উদ্বেগ ছড়িয়েছে, ট্রাম্প এই অবস্থানে পরিবর্তন আনতে পারেন। এমনটা হলে বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়বে।
কারণ, তাইওয়ান মার্কিন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রতিরক্ষা খাতের জন্য অপরিহার্য বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এখানে উৎপাদন হয়। দেশটি সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, বর্তমানে তাইওয়ান একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। তাদের মাথাপিছু জিডিপি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
এবং ট্রাম্প-শি’র বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ দাবিকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। সবশেষ গত ডিসেম্বরে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র রপ্তানি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এমন সমর্থনের পরও তাইওয়ানের অনেকের মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের ধারণা, শি জিনপিং হয়তো ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সমর্থন দুর্বল করতে চাইবেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যও এই শঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, বেইজিং সফরে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে শি-র সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের চায়না সেন্টারের ফেলো জোনাথন জিন সিবিএস নিউজকে বলেছেন, তিনি (ট্রাম্প) হয়তো অন্য কিছুর বিনিময়ে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে দর-কষাকষি করবেন। সেটা ইরান ইস্যুতে সাহায্য পাওয়া কিংবা কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়েও হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সবকিছুই আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসাযোগ্য।
তবে খোদ তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটন তাইপেকে ত্যাগ করবে না। বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের মন্তব্যের পর মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাইওয়ানের প্রতি তাদের স্পষ্ট ও দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।’ একইসঙ্গে চীনকে শান্তির জন্য ঝুঁকি হিসেবে অভিহিত করেছে তাইপে।
তাইওয়ান নিয়ে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে শি’র মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি বলেছেন তা জানা যায়নি। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘আগামী দিনগুলোতে’ আরো বিস্তারিত জানাবেন।
