ট্রাম্পের চীন সফরে গাম্ভীর্যের আড়ালে ভিন্নধর্মী ৫ ঘটনা
বেইজিংয়ের একটি বাগান পরিদর্শনের সময় শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার সকালে। ছবি: এএফপি
এএফপি
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ১৪:১০ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১৪:১৩
ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন পরিস্থিতি কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বেশকিছু গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে ভিন্নধর্মী কিছু ঘটনাও আছে।
যেমন- ট্রাম্প ও শি তাদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বন্ধুত্ব নিয়ে আলাপ করেছেন। বিদেশিদের সঙ্গে বৈঠকে চীনের নেতা সচরাচর ধ্রুপদী প্রবাদ বা কবিতার উদ্ধৃতি দিলেও এবার তিনি গ্রিক তত্ত্বের উদাহরণ টেনেছেন। কেএফসির খাবারে সাপ্তাহিক বিশেষ ছাড় ও ট্রাম্পের সফরকে মিলিয়ে রসিকতাও করেছেন চীনা নেটিজেনরা।
হাস্যরস হয়েছে প্রযুক্তিখাতের শীর্ষ দুই ব্যক্তি জেনসেন হুয়াং ও ইলন মাস্ককে নিয়ে। সাংবাদিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের বাদানুবাদও বাদ যায়নি।
‘আপনি কল করতেন, আমিও করতাম’
গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর বিশাল কক্ষে বৃহস্পতিবার আলোচনার শুরুতে ট্রাম্প চীনের নেতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বলেন, ‘আপনার বন্ধু হতে পারা আমার জন্য সম্মানের।’ শি-কে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি ও আমি একে অপরকে দীর্ঘ সময় ধরে চিনি। আমাদের মধ্যে একটি চমৎকার সম্পর্ক আছে। যখন সমস্যা দেখা দিয়েছে, আমরা একে অপরের পাশে থেকেছি এবং সমাধান বের করেছি। আমি আপনাকে কল করতাম এবং আপনিও আমাকে কল করতেন।’
জবাবে শি জিনপিং বন্ধুত্ব শব্দটি এড়িয়ে যান। এর পরিবর্তে তিনি বলেন, ‘তাঁদের দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং অংশীদার হওয়া উচিত।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শি-র স্বঘোষিত ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান ও ফ্রান্সসহ আরো কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায়ই ‘বন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
কোনো আলিঙ্গন নয়, শুধু করমর্দন
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, বেইজিং পৌঁছানোর পর শি জিনপিং তাঁকে একটি ‘বিগ, ফ্যাট হাগ’ বা উষ্ণ আলিঙ্গন করবেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর চিরচেনা আড়ম্বরপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তবে বৃহস্পতিবার সকালে ট্রাম্পের সেই প্রত্যাশিত উষ্ণ আলিঙ্গনের পরিবর্তে জুটল কেবল একটি দৃঢ় করমর্দন।
এই করমর্দনটি ১০ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয়। এ সময় মার্কিন নেতাকে শি-র হাতে কয়েকবার চাপ দিতে দেখা যায়।
থুসিডিডেস ট্র্যাপ
বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক বা বক্তৃতায় শি জিনপিং প্রায়ই প্রাচীন চীনের ধ্রুপদী প্রবাদ বা কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনা করতে গিয়ে ‘থুসিডিডেস ট্র্যাপ’ শব্দটি বেছে নেন। এটি একজন মার্কিন পণ্ডিতের উদ্ভাবিত একটি রাজনৈতিক পরিভাষা, যা প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডেসের ‘পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের’ বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
থুসিডিডেস ট্র্যাপ বলতে, উদীয়মান শক্তি যখন কোনো ক্ষমতাসীন শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তখন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হওয়াকে বোঝায়। বৈঠকে শি প্রশ্ন করেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুসিডিডেস ট্র্যাপ’ এড়িয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে?’ পরে নিজেই উল্লেখ করেন, এর উত্তর দুই নেতাকেই নির্ধারণ করতে হবে।
‘অত্যন্ত বাজে হোস্ট’
শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সফররত মার্কিন গণমাধ্যমকর্মী এবং চীনের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেট হলে ট্রাম্প ও শি যখন বসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ছবি তোলার জন্য সাংবাদিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। এ সময় ক্যামেরায় একজনের মুখে উচ্চারিত অশ্লীল শব্দ রেকর্ড হয়।
পরে দুই নেতা যখন ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অব হেভেন’ পরিদর্শনে যান, তখন চীনা নিরাপত্তা কর্মীরা একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে অস্ত্রসহ ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। এ কারণে মার্কিন সাংবাদিকদেরও মন্দিরে প্রবেশে প্রায় আধা ঘণ্টা দেরি হয়।
এরপর মার্কিন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মোটরবহরে যোগ দিতে কিছু সময়ের জন্য বাধা দেন চীনা কর্মকর্তারা। সেই দৃশ্যের একটি ভিডিও ফুটেজে শোনা যায়, চীনা কর্মীদের উদ্দেশে একজন আমেরিকান বলছেন, ‘আপনারা অত্যন্ত বাজে হোস্টের পরিচয় দিলেন।’
কেএফসি ও মিমের ছড়াছড়ি
ট্রাম্পের এই সফরকে কেন্দ্র করে চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো হাস্যরসাত্মক পোস্টে সয়লাব হয়ে যায়। অনেকেই মজা করে বলেন, ট্রাম্প চাইলে ‘ক্রেজি থার্সডে’ উপভোগ করতে পারেন। চীনে ফাস্টফুড চেইন কেএফসির একটি ভাইরাল প্রচারণা ‘ক্রেজি থার্সডে’ নামে পরিচিত।
দেশটিতে প্রতি বৃহস্পতিবার কেএফসির খাবারে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। যেটির সঙ্গে মিলিয়ে এআই দিয়ে ট্রাম্পের ফ্রাইড চিকেন খাওয়ার মিমও তৈরি করেন অনেকে।
এদিন চীনা সামাজিক মাধ্যম উইবো-তে ট্রাম্পকে ঘিরে দেওয়া হ্যাশট্যাগগুলো ট্রেন্ডিংয়ে ছিল। সফর সংক্রান্ত কিছু পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যেমন শুভেচ্ছা জানানো হয়, তেমনি রসিকতা করে কেউ কেউ লিখেন, বেইজিংয়ের প্রচণ্ড গরমের জন্য ট্রাম্পই দায়ী।
মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলে এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং ও টেসলার প্রধান ইলন মাস্কের উপস্থিতি নিয়েও নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক রসিকতা দেখা গেছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মাস্ক নিজের ফোনে ভিডিও করছিলেন। যা নিয়ে একজন উইবো ব্যবহারকারী লিখেন, ‘এই দৃশ্য আমেরিকার কোথাও দেখা সম্ভব নয়।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে মাস্ক দুনিয়ায় নতুন এসেছেন!’
- বিষয় :
- চীন সফর
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- শি জিনপিং
