জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুদকের অভিযান
জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের বাড়িতে অভিযান চালায় দুদক। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক ও রুপগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১৪:২১ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ | ২৩:৩৭
রাজধানীর অদূরে পূর্বাচলে বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের ‘জলসিড়ি’ আবাসিক প্রকল্পের ‘জয়িতা’ ভবনের ৯ তলা বাড়ির ৮ ও ৯ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট তল্লাশি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসময় সেখান থেকে দামি আবাবপত্র, পোশাকসহ নানা ধরনের মূল্যবানসামগ্রী পাওয়া গেছে।
সোমবার দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ সাংবাদিকদের ওই তথ্য জানিয়েছেন।
গত রোব ও সোমবার গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুটি ফ্ল্যাট তল্লাশি করে দামি দামি দেড় হাজার পণ্য পেয়েছে দুদক। দরজার তালা খুলে ফ্ল্যাট দুটি দুদকের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এর আগে গুলশানে পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুটি ফ্ল্যাটের তালা খুলে নিয়ন্ত্রণে নেয় দুদক। ভেতরে পাওয়া যায় অতি মূল্যবানসামগ্রী।

জানা গেছে, দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি আদালত বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মালিকানাধীন ওই বাড়িটি জব্দের আদেশ দেন। পরে দুদকের আরেক আবেদনে বাড়িটির দরজার তালা খুলে কমিশনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আদেশ দেন।
ওই আদেশে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলার আরডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার পারভেজের উপস্থিতিতে ৮ ও ৯ তলার ডুপ্লেক্সের তালা খুলে প্রবেশ করেন। পরে তার নেতৃত্বে তদন্ত টিমের সদস্যরা ভেতরে থাকা জিনিসপত্রের তালিকা (ইনভেন্টরি) তৈরির কাজ শুরু করেন। সোমবার তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার কাজটি শেষ করা হবে।
দুদক জানায়, জিয়াউল আহসান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই প্রকল্পের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫০৬ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর প্লটে নিজ বাড়ির ওই ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের ছবি, ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্তৃত ফ্ল্যাট দুটিতে দামি চেয়ার, টেবিল, সোফা থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দামি দামি আলমারিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পোশাক-পরিচ্ছদ। দামি ইলেক্ট্রনিক পণ্য ও ধাতবসামগ্রী পাওয়া গেছে সেখানে। এছাড়া আর্থিক অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলাটির তদন্ত পর্যায়ে সোমবার ওই বাড়িটির ৯ ও ১০ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের দরজার তালা খুলে প্রবেশ করা হয়।

জিয়াউল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ব্যাংকে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগে জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের গত বছরের ২৩ জানুয়ারি মামলা করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদক উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম।
দুদক সূত্র জানায়, তাদের ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৩৪২ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। জিয়া ও তার স্ত্রীর নামে পাওয়া গেছে ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভুত সম্পদ। ওসব সম্পদের বৈধ উৎস্য পাওয়া যায়নি। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি, দখল, প্রতারণা, জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান নিজ নামে ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। গাইডলাইন আব ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রান্সজেকশন-২০১৮ ও এফইপিডি সার্কুলার-৬ অনুযায়ী বর্তমান অনুমোদিত সীমা লঙ্ঘন করে নিজ হিসাবে ৫৫,০০০ মার্কিন ডলার জমা করেন। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করে স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতা ও যোগসাজশে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করে তার নামীয় ৮টি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন করেন।
আসামি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা ও সরজমিনে প্রদর্শন করে তার নামে নিবন্ধিত অনিবন্ধিত কোনো মৎস্য ও পোল্ট্রি খামারের বর্তমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পূর্বে ছিল মর্মেও কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ তিনি তার আয়কর রিটার্নে ওইসব খামার উল্লেখ করেছেন।

দুদক বলেছে, ২০২১-২০২২ করবর্ষ হতে ২০২৩-২০২৪ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটানে প্রদর্শিত টাকা তার কর্তৃক অর্জিত সম্পত্তির বিপরীতে বৈধ আয় হিসেবে মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। আসামি জিয়াউল আহসান এর প্রচুর কৃষিজমি থাকলেও কৃষি আয়ের স্বপক্ষে কোনো বৈধ রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়নি।
একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে এই কাজে নিজ পদ ও অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ১০৯ ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২), ৪(৩) ধারা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন তিনি।
জিয়ার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৫৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়। তার নামের ৪টি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে ২২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন পাওয়া গেছে। স্বামী জিয়াউল আহসানের সহযোগিতা ও পরস্পর যোগসাজশে ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

জাবেদের ২টি ফ্ল্যাট থেকে দেড় হাজার পণ্য উদ্ধার করা হয়
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের জব্দ থাকা ঢাকার গুলশানের দুই ফ্ল্যাটের দরজার তালা খুলে প্রবেশ করে গত রোব ও সোমবার তল্লাশি চালিয়ে মোট ২৬৯ ধরনের দেড় হাজার দামি দামি পণ্যের তালিকা তৈরি করেছে দুদক। ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুটের এ-৭ ফ্ল্যাটটিতে ১ হাজার ১৩৫টি ও ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুটের বি-৭ নং ফ্ল্যাটটিতে ৪শ পণ্য উদ্ধার করা হয়। সোমবার একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে যৌথ টাস্কফোর্সের প্রধান দুদক উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে পণ্য-সামগ্রীর তালিকা তৈরি করা হয়। সোমবারই তালিকা তৈরির কাজ শেষ করা হয়।
তল্লাশিতে এ-৭ ফ্ল্যাটটিতে ৩শর বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ৪টি রোলেক্সসহ ৮টি দামি ঘড়ির বাক্স, ৩ সেট মুক্তার গহনা, ৪টি অত্যাধুনিক ঝাড়বাতি, দামি সোফা একশটির বেশি কামিজ উদ্ধার করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের আধুনিক একটি বেড রয়েছে ফ্ল্যাটটিতে। রোলেক্স ঘড়ির ক্রয় রসিদও পাওয়া গেছে।
তাতে একেকটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাবেদের নামে যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেন আদালত। গত ১৩ জানুয়ারি আরব আমিরাতসহ আট দেশে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশও দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানি অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়। কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগ ও সম্পদ প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।