'আমরা যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে চাই না, কিন্তু কী করব?'
ঈদযাত্রায় বাস প্রতি ৩ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ
দৌলতদিয়া ঘাট থেকে বাস ছাড়ার আগে প্রতিটি বাসকে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ছবি: সমকাল
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৬:৪২ | আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ | ১৬:৪৪
ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের চাপের মধ্যে দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি বাসকে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চালক ও সুপারভাইজারদের ভাষায়, সিরিয়াল, কাউন্টার এবং ডিপার্চার-বিভিন্ন খাতে এই অর্থ আদায় করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত যাত্রী ভাড়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ একাধিক চালক ও সুপারভাইজার বলেন, 'আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে চাই না, কিন্তু কী করব?' বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অবশ্য বলছেন, শ্রমিক কল্যাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য এই অর্থ আদায় করা হয় এবং এটি সংগঠনের নিয়মিত ব্যবস্থা।
গত ২৭ মে বিকালে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, টার্মিনালজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে দূরপাল্লার বিভিন্ন পরিবহন। ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত বাস আনা হয়েছে।
চালক ও সুপারভাইজারদের অভিযোগ, সিরিয়াল, কাউন্টার এবং যাত্রী তোলা-এই বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ঈদে বাড়তি যাত্রী পরিবহনের সুযোগকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে বলেও তারা অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসকে টার্মিনাল থেকে ছাড়তে হলে আলাদা আলাদা খাতে টাকা দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত যাত্রী ভাড়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
বরিশাল থেকে আসা একটি বাসের সুপারভাইজার মো. ইমন হোসেন বলেন, এসব কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাস্তবতা এড়ানো যায় না। তার দাবি, যাত্রী তুলতে পারলেও কাউন্টার বাবদ দেড় হাজার টাকা, ডিপার্চার বাবদ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং সিরিয়াল বাবদ আরও অর্থ দিতে হয়। সব মিলিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।
যশোর থেকে আসা বাসচালক মো. রিয়াজ শেখ বলেন, ঈদের সময় দৌলতদিয়া ঘাটে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকে। নিজে যাত্রী তুললেও নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। তার মতে, এটি এখন এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন বাসের সুপারভাইজারদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনা, ঢাকা ও বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের বাসকে টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য আলাদা আলাদা ফি দিতে হয়। কেউ কাউন্টার থেকে যাত্রী তুললেও নির্ধারিত টাকা না দিলে বাস ছাড়তে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
খুলনা মেট্রো-ব ১১-০২৮২ নম্বর বাসের সুপারভাইজার মো. হেলাল মোল্লা বলেন, ফরিদপুর থেকে এসে এখানে ৫০০ টাকা ডিপার্চার দিতে হয়েছে। সবাই দিচ্ছে বলে বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে। ঢাকা মেট্রো-ব ১১-০০৩৪ নম্বর বাসের সুপারভাইজার মো. সৈয়দ হোসেন বলেন, বিভিন্ন খাতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। সিরিয়াল, কাউন্টার, ডিপার্চার-সব মিলিয়ে এটা এখানকার স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে গেছে। ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৭০৭ নম্বর বাসের চালক মো. হিমায়েত বলেন, প্রতি ঈদে আগের তুলনায় কিছুটা বেশি টাকা দিতে হয়। এবার কত দিতে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে।
অন্যদিকে ডিপার্চার বাবদ টাকা আদায়কারী মো. রুহুল আমিন বলেন, তিনি শুধু ৫০০ টাকা নেন এবং এটি মালিক সমিতির নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আদায় করা হয়। কেন এই টাকা নেওয়া হয়, তা মালিক সমিতি ভালো জানে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি খন্দকার মাহমুদুল হক জুয়েল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ডিপার্চার বাবদ যে টাকা নেওয়া হয়, তা শ্রমিক কল্যাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়। মালিকদের এতে কোনো আপত্তি নেই বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ঈদের সময় বহিরাগতরা টার্মিনালে এসে কাউন্টার খুলে অর্থ আদায় করে, যা শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো তাদের কাছে আসেনি। কেউ লিখিত বা মৌখিকভাবে অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
- বিষয় :
- ঈদযাত্রা
- দৌলতদিয়া
- বাস টার্মিনাল
- চাঁদাবাজি
