ঘরে ঘরে জ্বর, প্রয়োজন সতর্কতা
.
ডা. আহাদ আদনান
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৪
ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি, কাশির প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। শিশু থেকে মাঝবয়সি, বয়স্ক–সবাইকে কাবু করছে এই জ্বর। তিন দিনেও তাপমাত্রা নামছে না অনেকের। সেই সঙ্গে সর্দি-কফ জমছে। আবার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট। ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে, চিকিৎসকের চেম্বারেও। পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে, ছড়াচ্ছে অন্যদের মধ্যেও। জ্বর কমে গেলেও গায়ে, হাত-পায়ে অসহ্য ব্যথা ভোগাচ্ছে। দুর্বলতা কাটতে চাইছে না সহজে। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একজন না একজন জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অনেকেই এটিকে সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। সময়মতো যত্ন ও সতর্কতা না নিলে জটিল রোগে রূপ নিতে পারে। এ কারণে প্রয়োজন সঠিক তথ্য জানা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
কেন হচ্ছে এত জ্বর?
l ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ: ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া–এমনকি করোনাভাইরাসও জ্বরের মূল কারণ হতে পারে।
l আবহাওয়ার পরিবর্তন: গরম ও বর্ষাকালের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওঠানামা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
l অপরিষ্কার পরিবেশ: জমে থাকা পানি ও ময়লা-আবর্জনা মশার বংশবিস্তার ঘটায়, ফলে ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।
l সংক্রমণের গতি: পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যেও সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
জ্বরের সাধারণ লক্ষণ
l শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা ও প্রচণ্ড ক্লান্তি
l সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা
l হঠাৎ উচ্চ জ্বর বা দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার জ্বর
l চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি
l ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে হাত-পায়ে তীব্র ব্যথা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি
করণীয় ও যত্ন
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন: জ্বর হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: জ্বরে শরীর ডিহাইড্রেট হয়ে যায়। এ সময়ে হালকা স্যুপ, ফলের রস ও বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
হালকা খাবার খান: ভাত, ডাল, খিচুড়ি, সেদ্ধ সবজি–এ ধরনের সহজপাচ্য খাবার শরীরকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
তিন দিনের বেশি জ্বর স্থায়ী হলে, অথবা রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথাব্যথা বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
নিজেকে আলাদা রাখুন
জ্বর থাকলে পরিবারের অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা থাকুন, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
প্রতিরোধের উপায়
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন সি এবং ভিটামিন ডি খুবই কার্যকরী। নিয়মিত মৌসুমি ফল গ্রহণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। দিনের কিছুটা অংশ শরীরে রোদ লাগানোর চেষ্টা করুন। যাদের একান্তই রোদ লাগানোর সুযোগ নেই তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যেতে পারে। মধু, কালোজিরা, লেবু জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
l ঘরের ভেতর ও বাইরে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলুন।
l মশারি ব্যবহার করুন এবং মশা নিধনের ব্যবস্থা নিন।
l নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
l অসুস্থ হলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
l পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিনসমৃদ্ধ ফলমূল বেশি খান, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
অতিরিক্ত সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় ভাইরাসজনিত জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গু বা নিউমোনিয়ার মতো জটিল সংক্রমণও থাকতে পারে। এ কারণে শুধু ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা না করে লক্ষণ গুরুতর হলে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে। শিশু, বয়স্ক এবং যাদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ (ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃদরোগ) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জ্বর আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ সময় নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও সতর্ক করা জরুরি। ঘরে ঘরে জ্বরের এই প্রকোপ আমাদের জন্য সতর্কসংকেত। তবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সময়মতো যত্ন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে বেশির ভাগ জ্বরই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। মনে রাখতে হবে–অবহেলা নয়, সচেতনতা ও প্রতিরোধই হলো সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র।v
[শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ফয়সল হাসপাতাল, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ]
- বিষয় :
- জ্বর
