ডায়াবেটিস কিছু নিয়ম মেনে চলুন
ডা. ফারিয়া আফসানা
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এক ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনে বেশ কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। এ ধরনের প্রতিকূলতা ও তা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো হলো:
ঝুঁকি নিরূপণ: শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিই নয়, একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি তাঁর জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন মানসিক ঝুঁকির সম্মুখীন হন। ডায়াবেটিস চিকিৎসার কোন বিষয়টি একজন রোগীর মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে প্রথমেই তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এটি হতে পারে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা বেশি হওয়া, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, ওষুধ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ, পারিবারিক সহায়তা, নিয়মিত চিকিৎসের কাছে যাওয়া, খাদ্যব্যবস্থা ও ব্যায়ামের নিয়ম মেনে চলা। একজন চিকিৎসক অথবা ডায়াবেটিক এডুকেটরের সঙ্গে এ সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপের মাধ্যমে অনেকাংশেই এগুলো থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।
পারিবারিক সহায়তা: একজন ডায়াবেটিক রোগী অনেক সময় নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পরও দেখা যায় ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে ওই রোগীর বাড়ির পরিস্থিতি, পরিবারের অন্যান্য ব্যক্তির সহযোগিতা ও সচেতনতা কেমন তা খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সব নিয়ম জানা থাকার পরও পারিবারিক সহযোগিতার অভাবে ডায়াবেটিক রোগীর ওই নিয়মগুলো মেনে চলা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে রোগীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা ও ডায়াবেটিস-শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসা সেবাদানকারীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ: রোগী ডায়াবেটিসজনিত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন প্রতিকূলতা, পারিবারিক সহযোগিতার পরিস্থিতি, চিকিৎসার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা– প্রতিটি বিষয় নিয়েই একজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা প্রতিরোধ। একজন ডায়াবেটিক রোগীর ডায়াবেটিস শনাক্তের দিন থেকেই ডায়াবেটিস কী, কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় ও জটিলতা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো জেনে নেওয়া উচিত। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ডায়াবেটিস সেবাদানকারী হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু স্বাস্থ্যশিক্ষা নিলেই হবে না, দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ ও নিচের নিয়মগুলো মেনে চললে একজন রোগী ডায়াবেটিস সুনিয়ন্ত্রিত রেখে সুস্থ থাকতে পারেন।
সঠিক খাদ্যতালিকা নির্বাচন ও ব্যায়াম: সঠিক খাদ্যতালিকা নির্বাচন ও তা মেনে চলা। নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং এ দুটোর মাধ্যমে একটি স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা।
ধূমপান, তামাক, জর্দা পরিহার: এ অভ্যাসগুলো একদিকে যেমন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, অন্যদিকে ডায়াবেটিসজনিত বিভিন্ন জটিলতা যেমন–পায়ের রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে অকাল মৃত্যুর হারও বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং এ অভ্যাসগুলো বর্জনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং এর জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব।
রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতাগুলো ত্বরান্বিত হয়। রক্তের চর্বির মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। প্রচুর শাকসবজি গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসজনিত অন্য জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নিয়মিত ফলোআপ: পা ও চোখ পরীক্ষা, নিয়মিত ফলোআপ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে তা নয়, বছরে অন্তত ২-৩ বার বা প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি ফলোআপ প্রয়োজন। এই ফলোআপে প্রয়োজনে খাদ্য তালিকা পুনঃনির্বাচন, পা পরীক্ষা, রক্তচাপ নির্ণয়, চোখ পরীক্ষা ইত্যাদি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করে নিতে হবে।
দাঁতের যত্ন: ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই দাঁত ও এর সমস্যাগুলো অবহেলিত থাকে। দাঁত ও মাড়ির সমস্যায় অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, মাড়ির যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে দাঁতের বিভিন্ন জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পায়ের যত্ন: পা শরীরের সবচেয়ে অবহেলিত। নিয়মিত পা পরীক্ষা করা ও পায়ের যত্ন নেওয়া ডায়াবেটিস চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন পা পরিষ্কার করা, পায়ে ক্রিম বা লোশন লাগানো, নিয়মিত সঠিকভাবে নখ কাটা, সঠিক জুতা পরা, ডায়াবেটিস চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পায়ের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি পায়ের অনেক জটিলতা– যেমন পায়ের ক্ষত, নিউরোপ্যাথি, পায়ের রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধ করতে পারেন।
নিয়মিত সঠিক পরিমাণে ঘুম: ডায়াবেটিস চিকিৎসায় দৈনিক ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম অত্যাবশ্যক, এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ত্বরান্বিত হয়, মানসিক চাপ কমে এবং শরীর সুস্থ থাকে। দিনের বেলা বেশি সময় শুয়ে বসে থাকা বা ঘুম পরিহার করা উচিত। এ ছাড়া সারারাত জেগে থেকে দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে ঘুম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখে।
গ্লুকোমিটারের সাহায্যে নিয়মিত ডায়াবেটিস মাত্রা পরিমাপ: গ্লুকোমিটার ডায়াবেটিস চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য সরঞ্জাম। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির নিজের একটি গ্লুকোমিটার থাকা অত্যাবশ্যক। নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা মাপার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি খুব সহজেই রক্তের গ্লুকোজের মাত্রার ওঠানামা নির্ধারণ, ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা সমন্বয় করতে পারেন। v
[বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
- বিষয় :
- ডায়াবেটিস
