জলবায়ু পরিবর্তন কি আমাদের উচ্চতা কমিয়ে দিচ্ছে
ডাক্তারবাড়ি ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ১৫০ বছর ধরে মানুষের গড় উচ্চতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার মান এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখন থমকে যেতে পারে এবং এর পেছনে দায়ী হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন।
গবেষকরা দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২ লাখ শিশুর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। এই গবেষণায় মূলত সেই সব এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিকূল আবহাওয়া সরাসরি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে:
উচ্চ তাপমাত্রা: যেসব গর্ভবতী মা গর্ভাবস্থার অন্তত তিন মাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হন, তাদের সন্তানদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত তাপ শরীরের হরমোন ও বিপাকীয় কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে, যা ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে।
আর্দ্রতা: উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা যুক্ত হলে তা শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং পুষ্টি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না।
এই পরিস্থিতির শিকার শিশুদের উচ্চতা তাদের সমবয়সীদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। শুধু উচ্চতাই নয়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত মানুষের উচ্চতা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে–
জেনেটিক্স: বংশগতি বা বাবা-মায়ের উচ্চতা।
পুষ্টি: পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত খাবার।
তবে এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিবেশগত ফ্যাক্টর (বিশেষ করে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা) এখন মানুষের উচ্চতা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে অপুষ্টির হার বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক বৃদ্ধি আরও ব্যাহত করবে। খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ কৃষিজমির ক্ষতি করছে, ফলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
গবেষকরা আরও বলছেন, শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দূষিত পানি, অতিরিক্ত গরম এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। যদিও এই গবেষণাটি দক্ষিণ এশিয়ার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, গবেষকদের মতে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা।
পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তবে তা মানবদেহের বিবর্তনে বা শারীরিক গঠনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। ইউরোপ, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও একই ধরনের প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
[তথ্যসূত্র–বিবিসি]
- বিষয় :
- জলবায়ু
