জন্ডিস মানেই হেপাটাইটিস নয়
ডা. আফসানা ইয়াসমিন
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে পালিত হয়। শুরুতে জেনে নিই হেপাটাইটিস কী? হেপাটাইটিস হচ্ছে যকৃতের (লিভার) মধ্যে প্রদাহ। এটি সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমে বেশি হয়। হেপাটাইটিস A, B, C, D, E ভাইরাসগুলো দিয়েই মূলত ভাইরাল হেপাটাইটিস হয়ে থাকে।
কেন বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। মূলত জনসাধারণের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতিরোধ পরীক্ষা ও চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা।
এখন আমরা আসি এই ভাইরাসগুলো কীভাবে মানুষের শরীরে সংক্রমণ করে? হেপাটাইটিস A এবং E এগুলো বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে সংক্রমণ করে। যেমন সংক্রামিত স্ট্রিট ফুডস যেমন ফুচকা, আইসক্রিম, চটপটি খেলে পরে বাচ্চাদের হেপাটাইটিস হতে পারে। হেপাটাইটিস B, C এগুলো মূলত মায়ের থেকে জন্মের সময় বাচ্চার শরীরে আসতে পারে। এ ছাড়া সংক্রামিত রক্ত শরীরে দেওয়া হলে অথবা সংক্রামিত সিরিজ দিয়ে ড্রাগ নিলেও এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
হেপাটাইটিস হলে কী ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে–জন্ডিস যেমন চোখ-ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব গাঢ় রঙের হওয়া, প্রচণ্ড দুর্বলতা ও ক্ষুধামান্দ্য। দীর্ঘদিন জন্ডিস লিভার এনজাইম (ALT AST) অস্বাভাবিক হলে অথবা পরিবারের কারও হেপাটাইটিস B, C থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হেপাটাইটিস A, E দিয়ে আক্রান্ত শিশুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে কখনও কখনও একিউট লিভার ফেইলিউর (মরণঘাতী জটিলতা) হতে পারে, বিশেষত যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হয়ে হারবাল জাতীয় ওষুধ সেবন করে। হেপাটাইটিস B, C এগুলো দীর্ঘমেয়াদে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২০২৪ সালে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস B, C জনিত কারণে মারা গেছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে আমাদের বেশি নজর দেওয়া উচিত। কারণ এদের বড় অংশ হেপাটাইটিস B আক্রান্ত হয় জন্মের সময় বা জন্মের প্রথম কয়েক বছরে এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী ক্রনিক হেপাটাইটিস করে থাকে। অথচ এ সময় এদের কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। তাই এরা যখন শিশু গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের কাছে আসে তখন ইতোমধ্যে অনেক জটিলতা শুরু হয়ে যায়। অথচ সময়মতো টিকা দিলে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায় অথবা প্রথম দিকে চিকিৎসা শুরু করলে পুরোপুরি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখন আসি আমরা কীভাবে এই রোগের সংক্রমণ থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করতে পারি। হেপাটাইটিস এই ভাইরাস যেহেতু পানিবাহিত রোগ তাই নিয়মিত খাবারের আগে হাত ধোয়া, বিশুদ্ধ খাবার খাওয়া ও পানি পান করা এবং স্ট্রিট ফুড পরিত্যাগ করা উচিত।
এ ছাড়া সরকারিভাবে হেপাটাইটিস A-এর টিকা না দেওয়া হলেও আমাদের দেশে বেসরকারিভাবে পাওয়া যায়। এই টিকা দিয়ে দিলেও হেপাটাইটিস A হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। হেপাটাইটিস-বি যেহেতু জন্মগতভাবে মায়ের কাছ থেকে পায় তাই মায়ের যদি হেপাটাইটিস-বি বা সি থাকে, হেপাটাইটিস-বি এর টিকা জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময় শিডিউল পূরণ করা হয়। এমনকি আমাদের দেশে ২০০৫ সাল থেকে সব বাচ্চাকে টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা দেওয়ায় হেপাটাইটিস-বির নতুন সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হেপাটাইটিস সি-এর কোনো টিকা না থাকলেও এর চিকিৎসা আমাদের দেশে আছে, চিকিৎসা প্রথমেই শুরু করলে পরবর্তী জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হওয়া সম্ভব।
তাই মায়েদের স্ক্রিনিং এবং জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি সব দোষ সম্পূর্ণ করা, নিরাপদ খাদ্য ও পানি এবং সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা এই কয়েকটি পদক্ষেপে অসংখ্য শিশুকে ভবিষ্যতে লিভার রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ রোগ হিসেবে নির্মূল করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিটি দেশকে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। আমাদের দেশেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে সচেতনতার অভাব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অনেক অভিভাবকই মনে করেন, জন্ডিস না হলে হেপাটাইটিসের কোনো ঝুঁকি নেই। বাস্তবে হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে এবং ধীরে ধীরে লিভারের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। তাই শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবার, চিকিৎসক এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নবজাতকের সময়মতো টিকাদান, গর্ভবতী মায়ের হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা–এসব পদক্ষেপ হেপাটাইটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। সচেতনতা ও প্রতিরোধই পারে এই নীরব ঘাতক রোগের বিস্তার রোধ করতে এবং আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক প্রতিটি শিশুর জন্য হেপাটাইটিস মুক্ত সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
[কনসালট্যান্ট, পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি কেপিজে হাসপাতাল, গাজীপুর, ঢাকা]
- বিষয় :
- ডাক্তার