ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

ডেঙ্গু জ্বর: যা জানা জরুরি

ডেঙ্গু জ্বর: যা জানা জরুরি
×

  ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের পরিচিত জনস্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর একটি। প্রতিবছরই বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ অনেকের ক্ষেত্রে মৃদু জ্বর ও শরীর ব্যথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের আগে ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার কামড় এড়ানো এবং বাড়ি ও আশপাশে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার এবং জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই ফুলের টবের নিচের প্লেট, বালতি, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ছাদ বা বারান্দায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একবার পানি জমতে পারে এমন পাত্র খালি করে পরিষ্কার করা জরুরি।

শিশুর সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা
এডিস মশা দিন ও রাত–দুই সময়ই কামড়াতে পারে। সে কারণে রাতে মশারি ব্যবহার করলেই যথেষ্ট নয়। শিশুর বাইরে যাওয়ার সময় শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখার পোশাক পরানো এবং বয়স উপযোগী, অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুর ক্ষেত্রে মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের আগে পণ্যের নির্দেশনা ও বয়সসীমা অবশ্যই দেখে নিতে হবে। চোখ, মুখ, কাটা বা ক্ষতস্থানে এসব পণ্য ব্যবহার করা যাবে না। শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই হবে না; আশপাশের বাড়ি, স্কুল, খেলার মাঠ ও নির্মাণস্থলেও পানি জমে আছে কিনা, সেদিকে নজর দিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

জ্বর হলে কী করবেন?
ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং কখনও কখনও ত্বকে র‍্যাশ। সাধারণত জ্বর দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই মূল ব্যবস্থা। জ্বর ও ব্যথা কমাতে সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে শিশুর ক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রা অবশ্যই তার বয়স ও ওজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত। ব্যথানাশক ওষুধগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরীক্ষা কখন করবেন?
ডেঙ্গু শনাক্ত করতে রোগের সময়কাল অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। অসুস্থতার প্রথম সাত দিনের মধ্যে NS1 অ্যান্টিজেন বা NAAT/RT-PCR-এর মতো পরীক্ষা ডেঙ্গু শনাক্ত করতে কার্যকর হতে পারে। IgM অ্যান্টিবডি সাধারণত উপসর্গ শুরুর প্রায় ৪-৫ দিন পর শনাক্ত হতে শুরু করে। তবে কোন পরীক্ষা কখন করা হবে, তা রোগীর উপসর্গ, অসুস্থতার দিন এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
CBC বা রক্তের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে প্লাটিলেট, হেমাটোক্রিট ও অন্যান্য রক্তের পরিবর্তন চিকিৎসককে রোগের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর অবস্থা বা হাসপাতালে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়; রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা ও সতর্কতামূলক লক্ষণও বিবেচনা করতে হয়।

কোন লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিপদসংকেত বা warning signs চিনতে পারা। তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা কিংবা ত্বক ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। গুরুতর ডেঙ্গু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দ্রুত অবনতি ঘটাতে পারে।
বিশেষ করে শিশুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বমি, খাওয়া-দাওয়া কমে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক নিস্তেজতা দেখা দিলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

জ্বর কমলেই কি বিপদ কেটে যায়?
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্বর কমে যাওয়া সবসময় সুস্থ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ নয়। সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে, বিশেষ করে জ্বর কমার সময়, ডেঙ্গুর ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ শুরু হতে পারে। এ সময় রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, শক, রক্তক্ষরণ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই ঝুঁকিপূর্ণ সময় সাধারণত প্রায় ২৪-৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তাই জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীকে একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং বিপদসংকেতের প্রতি সতর্ক নজর রাখা জরুরি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা, সেটিও রোগীর অবস্থা দেখে চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

আতঙ্ক নয়, দরকার সচেতনতা 
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা এবং জ্বর হলে অবহেলা না করাই হতে পারে বড় সুরক্ষা।
ডেঙ্গুকে ভয় পাওয়ার চেয়ে রোগটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা বেশি জরুরি। জ্বরের শুরুতেই সচেতন হওয়া, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, বিপদসংকেত চেনা এবং জ্বর কমে যাওয়ার পরও সতর্ক থাকা–এই কয়েকটি বিষয় মনে রাখলেই ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হয়ে উঠতে পারে।   
[অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ) জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।

আরও পড়ুন

×