নাকে অ্যালার্জি কেন হয়
ডা. নূরুল হুদা নাঈম
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাকের অ্যালার্জি আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিচিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ থাকা কিংবা চোখ চুলকানোর মতো উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অনেকেই এটিকে সাধারণ সর্দি-কাশি মনে করে অবহেলা করেন, আবার কেউ কেউ অযথা ভয় পান। বাস্তবতা হলো–নাকের অ্যালার্জি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হলেও সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে এটি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সাধারণ সর্দি-কাশি সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে হয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। অন্যদিকে নাকের অ্যালার্জিতে বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক ও চোখ চুলকানো, নাক বন্ধ থাকা এবং কখনও কখনও ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে। অ্যালার্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট পরিবেশ বা উপাদানের সংস্পর্শে গেলে সমস্যা বেড়ে যাওয়া।
আমাদের দেশে নাকের অ্যালার্জির অন্যতম কারণ ধুলাবালি ও ডাস্ট মাইট। এছাড়া ফুলের রেণু, পশুপাখির লোম, ধোঁয়া, সুগন্ধি, ছত্রাক, বায়ুদূষণ এবং ঋতু পরিবর্তনের সময় বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন অ্যালার্জেনও এ সমস্যার জন্য দায়ী। বর্তমানে নগরায়ণ ও পরিবেশ দূষণ বাড়ার ফলে অ্যালার্জিজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে অ্যালার্জি বংশগত রোগ। বাস্তবে এর পেছনে বংশগত প্রভাব থাকলেও পরিবেশগত কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কারও অ্যালার্জি থাকলে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে, তবে সবার ক্ষেত্রে একইভাবে রোগ প্রকাশ পায় না।
নাকের অ্যালার্জিকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে সাইনোসাইটিস, নাকের পলিপ, ঘুমের ব্যাঘাত, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং কিছু ক্ষেত্রে হাঁপানির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই উপসর্গকে তুচ্ছ না ভেবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো অ্যালার্জির কারণ চিহ্নিত করে তা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসায় অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ, ন্যাজাল স্টেরয়েড স্প্রে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী ভালো থাকেন। নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি বা অ্যালার্জি ভ্যাকসিন দীর্ঘ মেয়াদে উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য–চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন নাকের ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক সময় রোগীরা সাময়িক স্বস্তির জন্য মাসের পর মাস ড্রপ ব্যবহার করেন, যা পরে নাকের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত ঘর পরিষ্কার রাখা, বিছানার চাদর ও বালিশের কভার ধোয়া, ধুলাবালি ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা উপকারী। পাশাপাশি উপসর্গ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অ্যালার্জি নির্মূল নয় নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক। এটি এমন একটি রোগ, যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা নাক বন্ধ থাকার মতো উপসর্গকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
[নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ লেজার সার্জন, পরিচালক-কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]
- বিষয় :
- চিকিৎসা