ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চোখে ঝাপসা দেখছেন

চোখে ঝাপসা দেখছেন
×

  ডা. আহসান কবির 

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

 চোখের সামনে আমরা অনেকে অনেক সময় ঝাপসা দেখতে পারি; যা  দৃষ্টিকে সমস্যা করে। আজকে আলোচনা করব হঠাৎ করে চোখের সামনে কালো গোল ঝাপসা দেখা, অথচ আশপাশ পরিষ্কার। এটি চোখের একটি বিশেষ রোগ। যে রোগের নাম CSCR অথবা CSR। বাংলায় বললে যা দাঁড়াবে তা হলো সেন্ট্রাল সেরাস করিও রেটিনোপ্যাথি অথবা সেন্ট্রাল সেরাস রেটিনোপ্যাথি। 

রোগটি কী
রোগটি জানার আগে আমাদের চোখের ভেতরের একটি বিশেষ এলাকা নিয়ে জানতে হবে। সেটি হলো চোখের দেখার পর্দা রেটিনার কেন্দ্রবিন্দু; যা অতি সংবেদনশীল ‘মেকুলা’ নামে পরিচিত। তার মাঝের আরও ছোট্ট সংবেদনশীল এলাকা হলো ‘ফোভিয়া’। যাবতীয় কিছু পরিষ্কার দেখার জন্য চোখের এই এলাকাটা দারুণ প্রয়োজনীয় এলাকা। আমরা যা দেখি তার আকৃতি-প্রকৃতি, রং নির্ধারণ করে এ এলাকা। এলাকাটা ‘কোন’ (CONE) নামক এক বিশেষ কোষ নিয়ে তৈরি। 
যদি কখনও আমরা চোখের সামনে ঝাপসা কালো গোলাকার এলাকা দেখতে পাই তখন মনে করতে হবে চোখের এ বিশেষ সংবেদনশীল এলাকা আক্রান্ত হয়েছে। 

কীভাবে আক্রান্ত হয়
চোখের এই সংবেদনশীল এলাকার আশপাশে অনেক রক্তবাহী শিরা রয়েছে।ওই শিরা থেকে যদি রক্তের জলীয় অংশ কোনোভাবে লিক করে কোষে জমা হতে থাকে এবং জমা হবার মাত্রা হিসেবে চোখে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া শুরু হয়; তখন ‘মাকুলা’ এলাকার কোষ ফুলেফেঁপে ওঠে। রেটিনা থেকে উঠে আসে; তখনই দেখার সমস্যা দেখা দেয়। 

এ রোগের লক্ষণ কী
সাধারণত লক্ষণ একটাই–তাহলো যন্ত্রণাবিহীন ঝাপসা কালো গোল ছায়া দেখা; যার আশপাশ পরিষ্কার অথচ সামনে কালো গোল ছায়া। 
স্বভাবত এমনটি হলে যেকোনো সংবেদনশীল মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক চোখে বেশি দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষ দুচোখেও হতে পারে। 

কেন হয়
রোগটা যে কেন হয় তার প্রাথমিক কারণ জানা যায় না। তবে আনুষঙ্গিক কিছু কারণ জানা যায়। তাদের অন্যতম হলো–
l হঠাৎ করে মানসিক দুশ্চিন্তা বা অতি পরিশ্রম বা শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা, অনিদ্রা। 
lযারা অনেকদিন নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে স্টেরয়েড ওষুধ খেয়ে থাকেন।
l অতিরিক্ত ধূমপান বা মদ্যপান। 
l ডায়াবেটিস ইত্যাদি অন্যতম। 

চিকিৎসা
এমন রোগী যদি চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে আসেন চিকিৎসকের কর্তব্য হলো রোগীকে তার রোগ সম্বন্ধে বুঝিয়ে বলা। মানে তাঁর চোখে সংবেদনশীল এলাকায় জলীয় পদার্থ জমেছে বা সহজ কথায় জল জমেছে। 
মাটিতে পানি জমে থাকলে ধীরে ধীরে তা শুকিয়ে যায়। তেমনি নতুন করে শিরা লিক না করলে যেটুকু পানি জমেছে সেটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে। ভয়ের কারণ নেই। যেহেতু হঠাৎ দুশ্চিন্তা এ রোগের অন্যতম কারণ, তাই রোগীকে অবশ্যই দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে এবং মনে করতে হবে তার কিছু হয়নি। 
দুশ্চিন্তামুক্ত ওষুধ, কিছু  প্রদাহনিরোধক ফোঁটা, ভিটামিন সি, ফলমূল, ঘুম, জীবনাচরণে পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন নয়। তবে সুস্থ হতে সময় লাগে। ক্ষেত্রবিশেষ  দুই মাসও লাগতে পারে। 
অনেকের পক্ষে এই লম্বা সময় কষ্টকর  মনে হলে চোখের এনজিওগ্রাফি, ওসিটি  করার পরে লিক এলাকা নির্ধারণ করে স্বল্পতাপের লেজার চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে Anti Vegf injection কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে। 
চোখে শিরা লিক করে পানি জমাটা সেরে যাবার পরও ভবিষ্যতে আবারও হতে পারে–এটি রোগীকে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে। 
আমার ব্যক্তিগত জীবনে এই রোগের রোগীদের বেশির ভাগই পুরুষ এবং শিক্ষিত সমাজের; বিশেষ করে যারা ব্যাংক কর্মচারী, বছরের বিশেষ সময় তাদের টার্গেট পূরণ করতে হলে দুশ্চিন্তা করতে ছোটাছুটি করতে হয় তাদের বেলায় হতে দেখেছি। 
এই সমস্যাকে হালকাভাবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, মনে রাখতে হবে এই রোগ চোখের সবচাইতে সংবেদনশীল এলাকা আক্রান্ত করে থাকে। তাই ভবিষ্যতে স্থায়ী দৃষ্টির সমস্যা হতে পারে।
[লেখক: চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফেকো সার্জন, যশোর]

আরও পড়ুন

×