ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সত্যের অনুভব

সত্যের অনুভব
×

প্রতীক বর্ধন 

প্রতীক বর্ধন 

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৭ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বছর ঘুরে আবার এলো দুর্গাপূজা। পূজার কথা মনে হলেই প্রথমে কিছু চিত্রকল্প মনে ভেসে ওঠে– ঢাকের বাড়ি, আরতি নৃত্য, সারাদিন মণ্ডপে আসা-যাওয়া, প্রসাদ বিতরণ, নাড়ু-সন্দেশের জন্য হাত পেতে থাকা ইত্যাদি। সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে তার সর্বজনীনতা। বাংলাদেশে মণ্ডপে যত মানুষের ভিড় হয়, তার উল্লেখযোগ্য অংশ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, মুসলমানই বেশি। 

উৎসব মাত্রই মানুষকে একত্র করে। ধর্মীয় উৎসবও এর ব্যতিক্রম নয়। দুর্গোৎসবের উপাসনার বিষয়টিই কেবল ধর্মীয়। ঢাকে বাড়ি পড়লে তখন কার মন নাচে না? হৃদয়ের এ নাচন বা আকুতিই মানবপ্রকৃতি। তাকে আটকে রাখার চেষ্টা অস্বাভাবিক। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসব প্রবন্ধে বলেছেন, ‘উৎসব একলার নহে। মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ–সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা। একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়।’ 

উৎসব কেবল আনন্দ বা ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানুষের সামাজিক, মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা বা অন্য যে কোনো উৎসব– সবই মানুষকে নতুন দক্ষতা, আনন্দ ও সম্পর্ক গড়ার সুযোগ দেয়। 

অমর্ত্য সেনের ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ অনুযায়ী, প্রকৃত উন্নয়ন কেবল আয় বা ধন-সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ কী করতে পারে এবং কী হতে পারে তার সুযোগ বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। উৎসব এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।এর ধারাবাহিকতায় বলা যায়, দুর্গাপূজা কেবল পূজা বা দর্শনের আনন্দ নয়; এটি শিল্প ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। স্থানীয় শিল্পী, প্যান্ডেল নির্মাতা, আলোকসজ্জাকারী, পোশাক ও হস্তশিল্প ব্যবসায়ী, শিল্পকর্মকার–সবাই এ সময় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। অর্থনীতিতে ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্ব তাই কোনোভাবে কম নয়; বরং গ্রামীণ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি ভিত্তি হচ্ছে উৎসব, বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব। বিশেষ করে দেশে এখন যে হাতেগোনা কিছু প্রতিমা কারিগর আছেন, ধর্মীয় উৎসব না থাকলে তাদের আয়-রোজগার একপ্রকার বন্ধই হয়ে যেত। অর্থাৎ এ পেশাই হারিয়ে যেত।
উৎসবের অর্থনীতির আরেকটি অনুষঙ্গ হচ্ছে দানধ্যান। দেশের অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি উৎসব উপলক্ষে গ্রামে বা শহরেও দান করে থাকেন। বিশ্বের অনেক দেশেই এই দানধ্যানের বড় ভূমিকা আছে। পূজা ও ঈদের সময় বিত্তশালী মানুষ গ্রামে গিয়ে দান করেন–এই রীতি অনেক পুরোনো। উন্নত দেশগুলোতেও দান-খয়রাত বাড়ছে। ওইসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব চেয়ার বা গবেষণা তহবিল আছে, তার বেশির ভাগই ব্যক্তির দান-খয়রাতে পরিচালিত।  সে জন্য দান-খয়রাত একেবারে উপেক্ষা করার যুক্তি নেই। অর্থনীতিবিদরা এ শাখার নাম দিয়েছেন ‘ইকোনমিকস অব অলট্রুইজম’ বা পরার্থপরতার অর্থনীতি।

দুর্গাপূজা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, বরং চিরন্তন বার্তা– জীবনে যত অশুভই থাকুক, শুভশক্তি তাকে পরাজিত করবে। দেবী দুর্গা সেই শক্তির প্রতীক, যিনি যুগে যুগে মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দেন– অসুর যতই প্রবল হোক, সুরের জয় অবধারিত।

প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×