দুর্গাপূজার আনন্দ ছিল শিউলিফুল কুড়োনো
সেলিনা হোসেন
সেলিনা হোসেন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি পেয়েছেন অনেক। এর মধ্যে ২০০৯ সালে একুশে পদক, ১৯৯৪ সালে ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। কথা বলেছেন সমকালের সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন ও জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক।
সমকাল: আপনার শৈশবের দিনগুলোতে দুর্গাপূজার বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
সেলিনা হোসেন: আমার স্মৃতি অনেকটাই খারাপ হয়ে গেছে। অনেক কিছু মনে করতে পারি না। তবে আমার বাবা পূজা দেখতে নিয়ে যেতেন। দুর্গাপূজার সময়ে আমাদের বিশেষ আনন্দ ছিল শিউলিফুল কুড়োনো। নদীর ধারে ছিল গোঁসাইদের আখড়া। সেই আখড়ার বিশাল আঙিনার দেয়াল ঘেঁষে ছিল বড় দু-তিনটে বকুলগাছ। সেই সব গাছের পাশে ছিল শিউলিফুলের গাছ। স্কুল ছুটির দিন সবাই মিলে ফুল কুড়োতে ছুটতাম।
সমকাল: সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশ কেমন ছিল– মনে পড়ে? মুসলিম ও হিন্দু পরিবারগুলো কীভাবে যুক্ত হতো?
সেলিনা হোসেন: বগুড়া ও রাজশাহীতে আমার শৈশব কেটেছে। বগুড়ায় আমি খুব ছোট ছিলাম। এরপর রাজশাহীতে যাই। আমার বান্ধবীদের সঙ্গে পূজা দেখতে যেতাম। আরতির ঘণ্টা বাজানো শুনলে আমরা পূজামণ্ডপে যেতাম। দেখতাম, কলকি আকারের মাটির পাত্রে ধূপ ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে সকাল-বিকেল নারী-পুরুষ আরতি করতেন। হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিতভাবে দেবীর সঙ্গে নৌকায় উঠতেন। মনে আছে আনোয়ার ভাইয়ের কথা। তিনি পায়ে ঘুঙুর বেঁধে অন্যদের সঙ্গে নৌকোয় নাচতেন। বলতেন, এটা আমাদের সবার উৎসব।
সমকাল: আপনার স্মৃতিচারণে বারুয়া মাঝির কথা এসেছে। তাঁর কথা মনে পড়ে?
সেলিনা হোসেন: বারুয়া মাঝিকে সম্প্রীতির বন্ধনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছি। করতোয়া নদী পার হওয়ার সময় তিনি ছোটদের কাছ থেকে পয়সা নিতেন না, বড়দের আগে ছোটদের পার করতেন। ঈদের সময় আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে বারুয়াকাকুর কাছে সেমাই-জর্দা নিয়ে যেতাম। ঈদের দিনে আমাদের কাছ থেকে সেমাই-জর্দার অপেক্ষায় থাকতেন। আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁর কাছে যেতাম। বলতাম, কাকু, ঈদের সেমাই। তাঁর উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা অভিভূত হয়ে যেতাম। এই বয়স পর্যন্ত তাঁর উজ্জ্বল মুখ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি সে স্মৃতি স্মরণ করে উৎসবের আনন্দ পাই। বুঝি উৎসব এমনই হওয়া উচিত।
সমকাল: নগরায়ণ ও আধুনিকতার কারণে পূজার রূপে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
সেলিনা হোসেন: বড় হওয়ার পরে ঢাকা শহরে অনেক পূজা অনুষ্ঠানে গিয়েছি; কিন্তু শৈশব-কৈশোরের সেই আনন্দ এবং উৎসবের আমেজ নতুন করে অনুভব করতে পারিনি। সে সময় উৎসবের ঘাটতি ছিল না। আমরা দেখতাম প্রতিমা বানানোর কত আয়োজন! আস্তে আস্তে গড়ে উঠত দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশের অবয়ব। অসুর তৈরি হওয়ার সময় আমরা সেটাও মজা করে দেখতাম। মনে হতো, দানবকে এভাবে মেরে ফেলা দরকার।
সমকাল: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আপনার সাহিত্যে কীভাবে এসেছে?
সেলিনা হোসেন: আমার সোনালি ডুমুর উপন্যাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান গভীর সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরেছি। কীভাবে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় দাঙ্গার বিভীষিকার মধ্যেও একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বজায় রেখেছিল, তা উঠে এসেছে। ধীরেন্দ্রনাথসহ বিশেষ কিছু চরিত্র উপন্যাসে উঠে এসেছে। আমার এক বান্ধবীর ঘটনা শৈশবেই বেশ রেখাপাত করেছিল। প্রাথমিকে আমরা একসঙ্গে পড়েছি, মাধ্যমিকে উঠব। বান্ধবীরা তখন ভারতে চলে যায়। আমরা আগে থেকে কিছুই জানতে পারিনি। স্কুলে তাকে না দেখে আমাদের মন খারাপ হয়েছিল। পরে তার চলে যাওয়ার বিষয়টি জেনে আরও কষ্ট পেয়েছিলাম।
সমকাল: আপনার একটি লেখায় পূজার সঙ্গে ঈদ উৎসবের স্মৃতিও একসঙ্গে এসেছে।
সেলিনা হোসেন: একবার ঈদ ও দুর্গাপূজা খুব কাছাকাছি সময়ে হয়েছিল। রোজার পরে ঈদের চাঁদ ওঠা দেখার জন্য আমরা ছোটরা মাঠের ধারে বসে থাকতাম। সূর্য ডুবে যেত। অন্ধকার নেমে আসত। আমরা বাটি ভরে মুড়ি-ছোলা-পেঁয়াজু-জিলাপি নিয়ে এসেছি। আজান হলে ইফতার খাব আর চাঁদের অপেক্ষায় থাকব। উৎসব বলতে আমাদের সামনে ছিল ঈদ আর পূজা। এই দুই উৎসবে থাকত অনেক খাবার, থাকত নতুন পোশাক পাওয়ার মজা। কোনো ছেলেমেয়ের নতুন কাপড় না পাওয়ায় চোখের জলও দেখেছি। তখন আমাদের ধর্মের আধ্যাত্মিক বিষয় বোঝার বয়স ছিল না। ধর্মের নামে হানাহানিও আমরা বুঝতে শিখিনি। আমাদের সামনে ছিল উৎসব। কখনও মনে হয়নি, দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসব। শুধু মনে হয়েছে, এমন উৎসব আছে বলেই আমরা এক জায়গায় জড়ো হই। আনন্দ করি।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সেলিনা হোসেন: সমকাল আমার প্রিয় পত্রিকা। আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা।
- বিষয় :
- দুর্গাপূজা
- সেলিনা হোসেন
- শারদীয় দুর্গাপূজা
