নানারূপে শারদোৎসব
মিলন কান্তি দত্ত
মিলন কান্তি দত্ত
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩২ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাঙালি হিন্দু সমাজে মহালয়ার দিন থেকে শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনীর সুর বেজে ওঠে। মহালয়ার দিনসহ পূর্ববর্তী চৌদ্দ দিনকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষ ও দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ হচ্ছে মহালয়া। শাস্ত্রমতে, ভগবান ব্রহ্মার নির্দেশে প্রয়াত পূর্বসূরিদের তিন পুরুষ সূক্ষ্মদেহে এই সময়ে মর্ত্যভূমিতে নেমে আসেন। প্রয়াতদের বিশাল (মহান) এ সমাবেশ অন্তরীক্ষে তৈরি হয়, তাই এ দিনটিকে বলা হয় মহালয়া (আবাস বা আলয়)। এ পক্ষের যেকোনো দিনে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করে শ্রাদ্ধ-তর্পণ করা হয়। তবে মহালয়ার দিনে স্মৃতি-তর্পণে গয়ায় পিণ্ডদানের মতো পুণ্য লাভ হয় বলে হিন্দুদের বিশ্বাস। পিতৃপক্ষের তর্পণ তিথির ব্যাপ্তি কেবল আত্মজনদের মধ্যে সীমিত থাকে না। মহালয়ার পর প্রতিপদ থেকে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও মূলত ষষ্ঠ দিনে দেবী বোধনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, যা বিজয় দশমীতে বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
দুর্গাপূজার অন্যতম অনুষঙ্গ কুমারীপূজা। শ্রীরামকৃষ্ণের মতে, ‘সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক-একটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ।’ স্বামী বিবেকানন্দ গুরুর মতকে প্রাধান্য দিয়ে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে ৯ জন কুমারীকে একসঙ্গে পূজার মাধ্যমে কুমারীপূজার সূচনা করেন। সে ধারা প্রতিটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মন্দিরে আজও অব্যাহত আছে। বেলুড় মঠে কুমারীপূজা প্রচলনের আগে স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৮ সালে কাশ্মীর ভ্রমণকালে ১৮ আগস্ট শ্রীনগর ক্ষীরভবনী মন্দিরে এক মুসলিম মাঝির চার বছর বয়সী কন্যাকে কুমারী হিসেবে পূজা করেন। সৃষ্টি, স্থিতি, লয়– এই ত্রিশক্তি কুমারীতে বীজাকারে নিহিত। কুমারীপূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন। কুমারী প্রকৃতি বা নারীজাতির প্রতীক। সেই কারণে নারীকে দেবীভাব এনে তাঁর পূজা করা হয়। মূলত ঈশ্বরেরই মাতৃভাবে আরাধনা করার জন্য কুমারীপূজা করা হয়।
পুরাণ, উপনিষদ ও মহাভারতে কুমারীপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু ক্ষিরোদ সাগরের তীরে মাটির মূর্তিতে দেবী দুর্গার পূজা করেন। সচরাচর এক চালায় সপরিবার মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষমর্দিনী, ডানপাশে দেবী লক্ষ্মী ও গণেশ, বামপাশে দেবী সরস্বতী ও কার্তিককে নিয়ে অতীতে দুর্গাপূজা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। এটিকে পারিবারিক বন্ধন ও মিলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনায় করা হয়, যা দুর্গাপূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দিক।
বাঙালি হিন্দুর অন্যতম ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজা হলেও উপমহাদেশের বাইরেও বিভিন্ন দেশে সাড়ম্বরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজায় একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দিকটি প্রাধান্য পেলেও ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ চেতনাকে ধারণ করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পূজার উৎসবে মানুষের অংশগ্রহণ, আন্তঃধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে। এককালীন কৃষিনির্ভর বাঙালি হিন্দুসমাজে শিক্ষায় এবং শিল্পে অগ্রগতির ফলে কর্মসূত্রে নানা জায়গায় একান্নবর্তী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুর্গাপূজা পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার এক অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়। হাজারো লোকের অংশগ্রহণ উৎসবের ব্যঞ্জনাকে বাড়ানোর পাশাপাশি মহামিলনের পটভূমি তৈরি করে।
দুর্গাপূজার আর্থিক দিকটিও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে প্রতিবছর মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ছে। গত বছরের চাইতে এ বছর তা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। বছর বছর পূজার সংখ্যা বাড়ার পেছনে কোথাও কোথাও অন্তর্দ্বন্দ্ব কারণ হলেও প্রতিমা নির্মাণ ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক দ্রব্যদির ব্যবহার, স্থাপনা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বিজ্ঞাপন, পোশাক-আশাক-গহনাগাটি ক্রয়-বিক্রয়, পূজার আনুষঙ্গিক উপকরণ ও ফলফলাদি, মেলা ইত্যাদির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে, যা বাংলাদেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যে নারীরূপী দেবীশক্তিকে স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর পূজা করেছেন এবং যে মহাশক্তি পৃথিবীর সকল নারীকে জীবন্ত বিগ্রহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সেই জীবন্ত নারীশক্তিকে আমরা কি পার্থিব জীবনে সেভাবে মর্যাদা দিতে পেরেছি কিংবা পারছি কিনা তা ভাবার মনে হয় সময় হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া পুরুষত্বের অহংকার, মানসিক দৈন্য ও কর্তৃত্ববাদী চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কয়েক দশক আগেও নারীকে পুরুষের আজ্ঞাবহ ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হতো না। প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাব এবং অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারীকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। সমাজের সর্বস্তরে নারীর প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার মধ্যে নিহিত দুর্গাপূজার সার্থকতা। জগন্মাতার শরণাগত হয়ে ষড়রিপু থেকে মুক্তিলাভ করে দেবীসত্তার জাগরণ ঘটাতে পারলে সার্থক হবে দেবী দুর্গার আরাধনা।
মিলন কান্তি দত্ত: সমাজকর্মী
- বিষয় :
- শারদীয় দুর্গাপূজা
- দুর্গাপূজা
- পূজা মণ্ডপ
