ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নানা সভ্যতায় সিংহবাহিনী দেবীর জয়গান

নানা সভ্যতায় সিংহবাহিনী দেবীর জয়গান
×

অদিতি ফাল্গুনী 

অদিতি ফাল্গুনী 

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৯ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নানা দেশের পুরাণে আগ্রহীদের কাছে অবিদিত নয়, ভারত বিশেষত বাংলায় যে সিংহবাহিনী দেবী দুর্গাকে নিয়ে মানুষের এত আবেগ, এমন সিংহবাহিনী রণদেবীর উল্লেখ রয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতায়ও। প্রাচীন রোমের সিবিলি, গ্রিসের রিয়া, ব্যাবিলনের ইশতার, সুমেরীয় ইনান্না, মিসরীয় শেখমেত থেকে ভারতের দুর্গা– কেন মানব সভ্যতার নানা পীঠস্থানে এই সিংহবাহিনী যোদ্ধাদেবীর প্রায় অভিন্ন প্রত্ন-প্রতিমা দেখতে পাওয়া যায়? হালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জের অবস্থান থেকে এর একটি কারণ নির্ণয় করেছেন। কিন্তু সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে দেবী দুর্গার মতো পৃথিবীর নানা সভ্যতার আরও কয়েকজন সিংহবাহিনী দেবী সম্পর্কে জানা যাক। 

সিবিলি
রোমের সিংহবাহিনী দেবী সিবিলি মূলত ফ্রিজীয় দেবী; যার উদ্ভব আজকের তুরস্ক বা প্রাচীন আনাতোলিয়া রাজ্যে। তাঁকে ‘ম্যাগনা মাতের’ নামেও ডাকা হয়। খ্রিষ্ট-পূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাজুড়ে তাঁর পূজা ব্যাপ্ত হতে থাকে। শুরুতে তদানীন্তন ফ্রিজীয় রাজধানী গোর্দিয়ামেই দেবী সিবিলির উপাসনা সীমিত ছিল। উপাসনার পরিধি যত বাড়ে, ততই স্থানীয় পুরাণ ও দেবদেবীর অনুষঙ্গও তাঁর পূজায় গৃহীত হয়। এই পূজার অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হচ্ছে সিংহ। 
সিবিলির উপাসনা আনাতোলিয়া থেকে বাণিজ্য, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সূত্র ধরে পৌঁছে যায় গ্রিস ও রোমেও। রোমকরা দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের পর থেকে এই দেবীর পূজা শুরু করেন; ২০৪ অব্দেই সিবিলির প্রতীক হিসেবে একটি কালো পাথর রোমে আনা হয়। পূজা অবশ্য সম্পন্ন হতে হতো ‘গাল্লি’ নামের বৃহন্নলা পুরোহিতদের মাধ্যমে। সিংহ এই দেবীর শৌর্য, সৌন্দর্য ও উর্বরতার প্রতীক।

রিয়া
খ্রিষ্ট-পূর্ব চার শতকে প্রথম গ্রিক ভাস্কর্যে গ্রিসের সিংহবাহিনী দেবী রিয়ার সন্ধান পাওয়া যায়। কোথাও তিনি সিংহবাহিনী, কোথাও দুই সিংহের রথে, কোথাও চারপাশে বেশ কিছু দণ্ডায়মান সিংহ নিয়ে সিংহাসনে উপবিষ্টা। গ্রিসে অবশ্য আনাতোলিয়া থেকে আসা ফ্রিজীয় দেবী সিবিলির সঙ্গে রিয়াকে একীভূত করা হয়। হোমার রিয়াকে উল্লেখ করেছেন ‘সব দেবদেবীর মাতা’ হিসেবে। রোদসের অ্যাপোলোন্নিয়াসের ‘অর্গোনোটিকা’য় রিয়া ও সিবিলির একীভূতকরণ সম্পন্ন হলে বলা হচ্ছে– ‘এই মায়ের ওপরই নির্ভর করে বাতাস, মহাসমুদ্র, অলিম্পাস পর্বতের তুষারাবৃত আসনের নিচে সমগ্র পৃথিবী। যখনই তিনি পর্বত ছেড়ে স্বর্গের গরিয়ান খিলানে প্রবেশ করেন, ক্রোনাসপুত্র জিউস স্বয়ং তাঁর জন্য জায়গা ছেড়ে দেন এবং অন্য অমর দেবতারাও এই ভয়াল দেবীর জন্য স্থান ছেড়ে দেন।’
দুর্গার সঙ্গে রিয়ার তবে দুটি মিল– পবর্ত ও সিংহ। রিয়ার উদ্দেশে উচ্চারিত ‘অর্গোনোটিকা’ ও দুর্গার উদ্দেশে উচ্চারিত ‘অর্গলা স্তোত্র’র ধ্বনিগত সাদৃশ্য ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাগত সাযুজ্যের কারণেও হতে পারে।

ইশতার
ব্যাবিলনীয় ও মেসোপটেমীয় পুরাণের দেবী ইশতার একই সঙ্গে যুদ্ধ, প্রেম ও উর্বরতার দেবী। সিংহ তাঁরও বাহন। একই দেবী আবার আক্কাদীয় বা সুমেরীয় সভ্যতায় ‘ইনান্না’ নামে পরিচিতা। রণকুশলী দেবী ইশতারের শক্তি, সাহস ও নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ‘সিংহ’ তাঁর পাশে সব সময়ই থাকে। যুদ্ধদেবী ইশতারের ক্ষিপ্রতা, গতি ও শৌর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে আর কে পারবে- অরণ্যের সিংহ ছাড়া? এ ছাড়া ইশতার মধ্যপ্রাচ্যের সেই সময়ের নানা নগরীর রক্ষাকর্ত্রী দেবীও ছিলেন। আজও যেমন দুর্গাকেই কখনও ঢাকেশ্বরী, কখনও চট্টেশ্বরী আর কখনও যশোরেশ্বরী বা বিভিন্ন নগর রক্ষার দেবী হিসেবে ডাকা হয়। ব্যাবিলনের ‘ইশতার তোরণ’-এ আজও বহু সিংহের প্রতিকৃতি আঁকা আছে। 

ইনান্না
ব্যাবিলনের দেবী ইশতারের প্রিয় দুই প্রাণী যেমন সিংহ ও ঘুঘু; আক্কাদীয় দেবী ইনান্নার তিন প্রিয় প্রাণী হলো– সিংহ, ঘুঘু ও সর্প (শক্তি, কোমলতা ও প্রজ্ঞা বা দ্বৈত চারিত্র্য)। ভারতীয় পুরাণে যেমন গৌরবর্ণা দুর্গারই আর এক রূপ নগ্ন-কৃষ্ণ দেবী কালী, সুমেরীয় পুরাণেও ইনান্না একটা সময় নগ্ন। প্রাক-ইসলামী আরবেও সিংহবাহিনী ও শুভ্রা দেবী ‘লাত’ আরেক রূপে কালো ও নগ্ন দেবী ‘উজ্জা’। এই দেবীরা কখনও বস্ত্রাবৃতা, কখনও নগ্ন।

শেখমেত
মিসরের দেবী শেখমেতের মুখ ছিল সিংহীর মতো ও দেহটি মানবীর। তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধ ও আরোগ্যের দেবী। দুর্গার উদ্দেশেও ‘অর্গলা স্তোত্র’-এ যেমন বলা হয় ‘দেহি সৌভাগ্যমারোগ্যং/দেহি দেবী পরং সুখম।’ সৌভাগ্য ও আরোগ্যের বর চাওয়া হয় তাঁর কাছে। শেখমেত তাঁর পিতা সূর্যদেবতা ‘রা’-এর বৈরীদের ধ্বংসে পিতৃ নির্দেশে যুদ্ধ শুরু করেন। দুর্গা যেমন মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের এক পর্যায়ে মধু পানের বিরতির পর দ্বিগুণ শক্তিতে যুদ্ধ করে সফল হন, শেখমেতও সামান্য বিরতি নিয়ে ডালিমের রস পান করে দ্বিগুণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বৈরীদের সংহার করেন। আজ অবশ্য ভারতের দুর্গা ছাড়া উপরোক্ত দেবীদের কেউই আর সেই প্রাচীন সভ্যতা বা জনপদগুলোয় পূজিতা হন না। একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর উত্থানের কারণে কিংবা মানব সভ্যতার অর্থনৈতিক বিকাশ এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বদলে পিতৃতান্ত্রিক পাটাতন দৃঢ়তর হওয়ার কারণে হয়তো এমনটি ঘটেছে। তবে হালের নক্ষত্রবিজ্ঞানীরা বলছেন একদম ভিন্ন কথা। মধ্যরাতের আগে বা সন্ধ্যার আকাশে তাকালে সিংহাকৃতি যে নক্ষত্রপুঞ্জ দেখা যায়, প্রাচীন যুগের মানুষ সেই সিংহাকৃতি নক্ষত্রপুঞ্জ দেখে দেখেই কি কল্পনা করেছে সিংহবাহিনী দেবী প্রতিমার কথা? কে জানে!
যাহোক, বাংলার সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা আসছেন। পর্বত বা গিরিনন্দিনী পার্বতী একই সঙ্গে রণকুশলী ও সংসারী; চার সন্তান-সন্ততির জননী। তাঁকে সব ভক্তের পক্ষ থেকে প্রণতি।

অদিতি ফাল্গুনী: কথাশিল্পী 

আরও পড়ুন

×