ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শৈশবের জাদু

শৈশবের জাদু
×

বিদ্যা সিনহা মিম

বিদ্যা সিনহা মিম

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩১ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরতের হালকা বাতাস! আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর দুপুরের রোদ যেন সব জায়গায় সোনালি ফোঁটা ছিটিয়ে দিয়েছে। এই সময়টা আমার সবচেয়ে প্রিয়। শারদীয় দুর্গাপূজার কয়েকটা দিন। ছোটবেলায় থেকে আজও, এই সময়ে জীবনটা যেন অন্যভাবে দেখা যায়। চারপাশের রঙ, ফুলের গন্ধ, মানুষের ব্যস্ততা, আর হ্যাঁ, নিজের ছোট ছোট আনন্দ– সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর সময়। 

দুর্গাপূজার সময় মা আর দাদি মিলে প্রতিমা সাজাতেন। আর আমি বসে ফুলের মালা গাঁথতাম। মনে হয়, প্রতিটি ফুল বলছে, ‘আমাকে স্পর্শ করো, আনন্দ ছড়িয়ে দাও।’ ছোটবেলায় ঘর সাজাতাম ফুল আর রঙিন কাগজ দিয়ে। পূজার দিনগুলোয় ঘরে ঢুকলেই নাকে আসত চন্দন, ধূপ আর ফুলের মিশ্রণে অদ্ভুত এক ধরনের সুবাস। সেই ঘ্রাণটা এখনও মনে পড়ে। 

বাড়ি সাজানোর পর আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ মণ্ডপ ভ্রমণ– প্রতিটি মণ্ডপ, প্রতিটি প্রতিমা দেখা। এগুলো যেন জীবন্ত গল্প। আলোর খেলা, ঢাকের শব্দ, মানুষের ছোটাছুটি এক জীবনানুভূতি। যখন আমি কোনো দেবীর প্রতিমা দেখি, তখন আমার কাছে মনে হয় প্রতিটি দেবীর চোখে আলাদা গল্প লুকিয়ে আছে। কারও চোখে করুণা, কারও চোখে শক্তি, আবার কারও চোখে শান্তি। আমি দাঁড়াই, শুধু তাকাই, মনে হয় আমিও সেই গল্পের অংশ। কখনও আমি ভেতরে ভেতরে হেসে নিই, কখনও চুপচাপ ভাবি, ‘কী অদ্ভুত সুন্দর’! 

রাতের মণ্ডপ আলাদা। আলো ঝলমল, ঢাকের তাল বাজছে, মঞ্চে নাচ চলছে। সবই যেন জীবন্ত চিত্র। বন্ধুদের সঙ্গে ফটোগ্রাফি, মিষ্টি খাওয়া, হালকা গান। কখনও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু দেখি। প্রতিটি মুখে আনন্দ, প্রতিটি পদক্ষেপে উৎসবের ছন্দে হৃদয় ভরে যায়। মাঝে মাঝে আমি মাথা কাত করি, নিঃশব্দে ভাবি, ‘এই আনন্দটা ধরে রাখব; মনে রাখব সবকিছু।’

ছোটবেলার পূজার দিনগুলো আমার কাছে অমলিন সুখের মতো। পূজার ছুটিতে ঘুরে বেড়াতাম কখনও দাদাবাড়ি আবার কখনও নানাবাড়ি। আত্মীয়রা আসত, আমাদের একসঙ্গে খেলাধুলা, মেলায় যাওয়া, মিষ্টি খাওয়া হতো। শৈশবের পূজা সত্যিই এক অন্যরকম জাদু। রাজশাহীর পদ্মা নদীর ধারে নৌকাবাইচ, নদীর ঠান্ডা হাওয়া, বাড়ির পাশে বিশাল মেলা– সব আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, যদি সময়টা ফিরে আসত, আমি আবার সেই আনন্দ অনুভব করতে পারতাম। আবার সেই ছোট্ট কিশোরী হয়ে ফিরতাম!

কখনও ভাবি, ‘কেমন হতো, যদি আমি আবার সেই নদীর তীরে দাঁড়াতাম, নৌকায় দুলে দুলে আনন্দে ভেসে যেতাম?’ কিন্তু এখন আর সেভাবে মেলায় যাওয়া হয় না। সেই আনন্দের খোঁজও পাওয়া যায় না। কেমন যেন শূন্যতা লাগে! যেন সেই উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা কোথাও হারিয়ে গেছে। 

বরাবরের মতো এবারও পূজা উদযাপন করছি পরিবারের সঙ্গে। এবারের পূজায় রাজশাহী যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। ঘর সাজানো, রান্নাবান্না, অতিথি আপ্যায়ন হবে। কিন্তু আগের মতো অনেক কিছুই করতে পারি না। কারণ যেখানেই যাই, ভক্ত আর শুভাকাঙ্ক্ষীর ভিড় হয়ে যায়। মাঝে মাঝে বাসা থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে যায়। 
পূজার ছুটি মানে শুধু পূজামণ্ডপ বা মেলা নয়। কখনও কখনও বসে থাকি বারান্দায়, হাতে চায়ের কাপ, ভেতরে ভেতরে ভাবি, এই মুহূর্তটা যেন কখনও চলে না যায়।’ পূজার দিনগুলোতে ঘরে বসে থাকলেও, বাইরে ঘুরলেও আমি চাই, এই পূজা যেন সবার আনন্দে, শান্তিতে, ভালোবাসায় ভরে ওঠে। 

বিদ্যা সিনহা মিম : অভিনয়শিল্পী

আরও পড়ুন

×