ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মায়ের পূজার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য

মায়ের পূজার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য
×

স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ 

স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ 

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৫ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মথুর বাবুর জানবাজারের বাড়িতে দুর্গোৎসব। সেবার পূজা উপলক্ষে সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ উপস্থিত। পূজা তো সে বাড়িতে প্রতিবারই হয়, সমারোহও কম হয় না। এবার যেন পূজাকে কেন্দ্র করে একটি অপার্থিব বাতাবরণ রচিত হয়েছে। 

সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী– তিন দিন মায়ের পূজায় পরম আনন্দে কেটে গেল। বিজয়া দশমীর প্রাতঃকাল সমাগত। দশমীর বিহিতপূজাও হয়ে গেল। পুরোহিত দেবীকে প্রণাম করার জন্য মথুর বাবুর কাছে খবর পাঠালেন। কারণ এবার মায়ের বিসর্জন হবে। দর্পণ বিসর্জন। এটিই আসল বিসর্জন। সন্ধ্যার পর প্রতিমা বিসর্জন। ওদিকে মথুর বাবু ছিলেন পূজার আনন্দের ঘোরে। বিজয়া দশমীর কথা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তীব্র মর্মবেদনা অনুভব করলেন। মথুর বাবু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন: ‘না, এ আনন্দের হাট আমি ভাঙতে পারব না।’

পুরোহিতের বারবার তাগাদায় বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে মথুর বাবু ভৃত্যের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠালেন– ‘আমি মাকে বিসর্জন দিতে দেব না। মায়ের পূজা যেমন হচ্ছিল, তেমনই হবে। সাবধান, যদি কেউ মাকে বিসর্জন দেয় তো তার ঘাড়ে মাথা থাকবে না। রক্তারক্তি করে আমি ছাড়ব।’ পুরোহিত সে কথা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সবাই তখন পরামর্শ করে মথুর বাবু সম্মান করতেন পরিবারের এমন সদস্যদের তাঁর কাছে পাঠালেন। সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো। মথুর বাবুর স্ত্রী রানী রাসমণির কন্যা জগদম্বার কাছে সংবাদ গেল। মথুর বাবুর স্বভাব তিনি বিলক্ষণ জানতেন। চকিতে তাঁর মনে পড়ল তাদের ‘বাবা’ অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ মথুর বাবুর কাছে গিয়ে দেখলেন, মথুর বাবুর মুখ গম্ভীর। একাকী অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখেই মথুর বাবু কাছে এসে বললেন– ‘বাবা, যে যাই বলুক, আমি কিন্তু প্রাণ থাকতে মাকে বিসর্জন দিতে পারব না। আমি সে কথা বলে দিয়েছি। আমি মায়ের নিত্য পূজা করব। মাকে ছেড়ে কেমন করে আমি থাকব?’

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
শ্রীরামকৃষ্ণ মথুর বাবুর বুকে হাত বোলাতে বোলাতে স্নেহপূর্ণ কণ্ঠে বললেন– ‘ওঃ, এই তোমার ভয়? ছেলেকে ছেড়ে মা কি কখনও থাকতে পারে? মা এ তিন দিন বাইরের দালানে বসে; তোমার পূজা নিয়েছেন, আজ থেকে তোমার আরও কাছে থেকে; সর্বদা তোমার হৃদয়ে বসে তোমার পূজা নেবেন।’ শ্রীরামকৃষ্ণের এ কথায় ক্রুদ্ধ মথুর বাবু তৎক্ষণাৎ শান্ত হয়ে গেলেন।

মথুর বাবু বুঝলেন মায়ের আসল পূজা বাইরে নয়, অন্তরে। বাইরের দালানে মায়ের পূজা মাত্র তিন দিনের, অন্তরের দালানে মায়ের উপস্থিতি নিত্যদিনের, নিত্যক্ষণের। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায়, হৃদয় তাঁর ‘ডঙ্কামারা’ ভূমি। তাই তো হৃদয়কে বলা হয় হৃদয়মন্দির। মা সর্বশক্তির মূল, স্বয়ং শক্তিস্বরূপিণী। আমার অন্তরেই যখন সেই মায়ের নিত্য উপস্থিতি তখন আমি কী করে শক্তিহীন হতে পারি, কী করে দুর্বল হতে পারি? যা আমাকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যায়, অশুভের পথে নিয়ে যায়, অকল্যাণের পথে নিয়ে যায়–সেই বৃত্তির সঙ্গে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে এবং তাকে সমূলে নাশ করতে হবে। এ সংগ্রামের শক্তি এবং পরিশেষে বিজয়ের শক্তি আমরা আমাদের ভেতর থেকেই পাব। আমাদের অন্তরনিবাসিনী মায়ের কাছ থেকেই পাব।

মায়ের পূজা আসলে আমাদের সেই অন্তর্নিহিত শক্তির উদ্বোধনের প্রতীকী প্রক্রিয়া। আমাদের অন্তরে যিনি চৈতন্যরূপে অধিষ্ঠান করছেন, যাকে বেদান্ত ব্রহ্ম বলে আখ্যা দেন, তাঁরই আর এক নাম ‘মা’। শাস্ত্রের পরিভাষায় তিনি হলেন আদ্যাশক্তি। শুধু নাম-ভেদ, বস্তু একই। বেদান্ত যে মানুষের মধ্যে ব্রহ্মের জাগরণের কথা বলেন, তা এই আদ্যাশক্তিরও জাগরণ। কর্ণের কবচ কুণ্ডলের মতো এই শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই আমরা জন্মগ্রহণ করি। তাই তাকে আহরণ বা অর্জন করার কোনো ব্যাপার নেই; যা আছে তা শুধু বিকাশের ব্যাপার, অভিব্যক্তির ব্যাপার।

দেবীর পূজায় সেই প্রতীকী তাৎপর্যটিই নিহিত। মানুষের অন্তরস্থ শুভশক্তিই দেবী এবং অশুভশক্তিই মহিষাসুর। শুভশক্তির জাগরণের মাধ্যমে অশুভশক্তির বিনাশ। কথিত আছে, পুরাকালে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য দেবীর আরাধনা করেছিলেন এবং দেবীর বরে রাবণকে বধ করেছিলেন। রাবণকে বধ করার জন্য রামের প্রয়োজন হয়েছিল দেবীর আরাধনার অর্থাৎ দেবীর প্রসন্নতার; অন্তরে দেবীর জাগরণের। সেই জাগরণেই সর্বসিদ্ধি। রাম ও রাবণ প্রতীক। প্রতীক শুভচেতনার মানুষের এবং অশুভচেতনার মানুষের। শুভচেতনার মানুষের সংখ্যা বাড়ার ওপর নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও দেশের সমৃদ্ধি। অশুভচেতনার মানুষের সংখ্যা বাড়লে পরিবার, সমাজ ও দেশ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। দেবীর পূজায় সেই বার্তাই উন্মেষিত। 

রাবণের ওপর রামের সেই বিজয়সাধন থেকেই নাকি ‘বিজয়া’ উৎসবের প্রচলন। কারও কারও মতে ‘বিজয়া’ শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে ‘বি’ পূর্বক ‘জি’ ধাতু থেকে। ‘জি’ ধাতুর অর্থ জয় করা। ‘বি’ অর্থাৎ বিশেষভাবে জয় করা। এই ‘বিশেষভাবে’ জয়ের অর্থ হচ্ছে আমাদের মালিন্যের ওপর জয়, আমাদের সংকীর্ণতার ওপর জয়, আমাদের ক্ষুদ্রতার ওপর জয়, আমাদের দুর্বলতার ওপর জয়, আমাদের কাপুরুষতার ওপর জয়। যদি সেই ‘বিশেষ জয়’ আমরা লাভ করতে না পারি তাহলে কীসের পূজা, কীসের মাতৃভক্তি? আজ আমরা আমাদের অন্তরস্থিত শক্তিকে জাগরণের জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা করছি, যাতে আমরা আমাদের সব দুর্বলতাকে জয় করে ‘প্রকারে’ মানুষ হতে পারি। যখন প্রকারে আমরা সবাই মানুষ হবো, তখনই সৃষ্টি হবে এক নতুন সভ্যতা। তখনই হবে সত্যিকারের বিজয়া-বিজয়োৎসব। শক্তিস্বরূপিণী মায়ের সন্তান আমরা। আসুন, আমাদের সব দুর্বলতার জঞ্জালস্তূপে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেই বিজয়োৎসবের আজই সূচনা করে দিই। 

স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ: অধ্যক্ষ ও সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা

আরও পড়ুন

×