ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এবারও চামড়ার বাজারে হতাশা, রাস্তা-নদীতে ফেলেছে অনেকে

এবারও চামড়ার বাজারে হতাশা, রাস্তা-নদীতে ফেলেছে অনেকে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৩

ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচায় পুরোনো ও পরিচিত হতাশা এবারও। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। ন্যায্য দাম না পেয়ে বা কোথাও ক্রেতা না পেয়ে কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া রাস্তায় বা নদীতে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।

২০১৯ সালের ঈদকেন্দ্রিক চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধসের পর এতটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও দর পতন আর দেখা যায়নি। কেবল রাজধানী ঢাকা নয়; বরং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নাটোর, কুমিল্লা, ফেনীসহ দেশের বড় চামড়া মোকামগুলোতেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

এমন চিত্রের পরও ট্যানারি মালিক ও কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী আড়তদারদের সংগঠনের নেতারা জানান, তারা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে পারবেন। দর পতন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কিছু ঘটনার কথা স্বীকার করলেও এ জন্য তাদের কোনো দায় নেই বলে দাবি করেছেন।

ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের দাবি, পশু কোরবানির পর দ্রুততম সময়ে আড়তে বা ট্যানারিতে না পাঠানোর কারণে চামড়া নষ্ট হয়েছে। স্বাভাবিক কারণে নষ্ট চামড়া কিনে কেউ লোকসান করতে চাইবে না। এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকার বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করলেও অনেকে চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করে উল্টো চামড়া ও লবণ– দুটোই বিক্রি করার চেষ্টা করেছে। এতেই সমস্যা হয়েছে।

ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় আর্থিক সংকট এবং ট্যানারি মালিকদের থেকে আড়তদাররা আগের বকেয়া টাকা ফেরত না পাওয়ায় পর্যাপ্ত চামড়া কেনায় আগ্রহ দেখাননি বলে জানা গেছে। যার ফলে চামড়ার চাহিদা কমার কারণে নির্ধারিত ন্যায্যমূল্য হারিয়েছে।

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বিটিএর সভাপতি শাহীন আহমেদ সমকালকে জানান, ঈদের প্রথম তিন দিনে গতকাল রোববার পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীর ট্যানারিগুলো প্রায় ছয় লাখ চামড়া সংগ্রহ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় অন্তত দেড় লাখ পিস বেশি। আর কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ স্কিন অ্যান্ড হাইড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু 

সুলতান সমকালকে জানান, এবার পোস্তার চামড়ার আড়তগুলো ৮০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এ লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। দেশব্যাপী কত চামড়া সংগ্রহ হয়েছে, সে তথ্য পেতে আরও দুই সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত মনিটরিং টিমের সদস্যরা জানিয়েছেন।

দাম না পাওয়ার হতাশা সর্বত্র
কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতিবছরের মতো এবারও দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে চামড়ার বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

এ বছর ঈদুল আজহার দিন (গত বৃহস্পতিবার) দুপুরের পর থেকেই রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা থেকে পোস্তায় কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরা ট্রাক, ভ্যান ও রিকশায় কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন। 

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত মূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন। মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. ফরিদের অভিযোগ, প্রতিবছর সরকার দাম ঘোষণা করলেও বাজার তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি জানান, দাম না পেয়ে তাঁর পরিচিত এক মৌসুমি ব্যবসায়ী পোস্তার রাস্তায় চামড়া ফেলে গেছেন। এবার তাঁর দেড় লাখ টাকা লগ্নির পুরোটাই খোয়া গেছে বলে শুনেছেন।

ঢাকার বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসা থেকে লবণ ছাড়া চামড়া বিক্রি করতে আসা ব্যক্তিরা জানান, গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। ছোট গরুর চামড়া নিতে চায়নি অনেক আড়তদার। নিলেও ১০০ থেকে ২০০ টাকা দর দিতে চেয়েছে। মাঝারি গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। বড় চামড়া কেনাবেচা হয়েছে ৬০০ টাকার মধ্যে। অথচ গত বছরও ১৫ থেকে ২০ বর্গফুটের মাঝারি চামড়ার ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছিল। এবারও ছাগলের চামড়া কেনায় আগ্রহ ছিল ব্যবসায়ীদের।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একজনের অভিযোগ, ৫৪ ইঞ্চি মাপের বড় গরুর চামড়া ৯০০ টাকায় কিনে পোস্তায় এনে ৫০০ টাকার বেশি দাম পাননি। ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন বলেন, ৬০০ টাকা করে কিনে এনে ৪৫০ টাকা দাম বলছে। এটা ছিল সোনার ব্যবসা। এখন হয়ে গেছে মাটির ব্যবসা। মাটির দামও তো এর চেয়ে বেশি।

পোস্তার আড়তদাররা জানান, সরকার যে লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা অনেকেই বুঝতে চান না। কাঁচা চামড়া যে নষ্ট নয়, লবণ দিতে লবণের দামের সঙ্গে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ আছে। প্রতি চামড়ায় খরচ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তার ওপর ট্যানারিগুলো আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া কেনার সময় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাদ দেয়। আবার ২০ বর্গফুটের নিচে চামড়া কেনে না তারা। ফলে সব মিলিয়ে চামড়া কিনতে হয় আড়তদারদের।

চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা
এবার দাম না পেয়ে চামড়া ফেলে দেওয়া ও মাটিতে পুঁতে ফেলার অনেক ঘটনা ঘটেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। ঈদের দিন রাতে ঢাকার পোস্তায় স্তূপকৃত চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো ও আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় দাম না পেয়ে, কেউ ক্রেতা না পেয়ে রাস্তার ওপর চামড়া ফেলে গেছেন।

মৌলভীবাজারের বালিকান্দি গ্রামে চামড়া ব্যবসায়ীরা ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে শত শত চামড়া মনু নদীতে ফেলে দেন। ব্যবসায়ী হাফিজ এনামুল হক শাহনুর জানান, লবণ সংকটের কারণে তারা চামড়া নষ্ট ঠেকাতে পারেননি। তাই ৪০০ থেকে ৫০০ পিস চামড়া নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন। জানা গেছে, ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় কাটাখালী নদীতে চামড়া ফেলে দেন দুই মৌসুমি ব্যবসায়ী খুরশিদ আলম ও দিদারুল আলম। পরে উপজেলা প্রশাসনের জেরার মুখে তারা ক্ষমা চান। চামড়া বিক্রি করতে না পেরে কুমিল্লায় ১০ টন চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর মিলেছে।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা বলেন, তারা প্রতিটি চামড়া গড়ে ৫০০ টাকায় কিনলেও বাজারে এর দাম ২০০ টাকাও উঠছে না। বছরের পর বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান দিতে দিতে বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন। গত বছরও চামড়া ঢাকার রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল এবং কয়েক বছর ধরে কেউ কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন।

ট্যানারিতে সরাসরি বিক্রিতে কিছু দর মিলছে
আড়তে বিক্রি করতে গিয়ে দাম নিয়ে জটিলতায় এখন অনেক এতিমখানা ও মাদ্রাসা সরাসরি ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি করছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল আমান মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এবার তাদের প্রতিষ্ঠান এলাকা থেকে মোট ৭২৬টি গরুর চামড়া এবং ৪১৬টি খাসির চামড়া সংগ্রহ করেছে। প্রতিটি গরুর চামড়া গড়ে গত বছরের তুলনায় ২০ টাকা কমে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন সাভারের আঞ্জুমান ট্যানারিতে। এর আগে আরও তিন ট্যানারি এ চামড়ার দর ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বলেছিল। খাসির চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ১০ টাকা দরে।

মোস্তাফিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ৮-১০ বছর আগেও একেকটি চামড়া ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, অথচ বর্তমানে টাকার মান কমলেও চামড়ার দাম তলানিতে ঠেকেছে। চামড়া সংগ্রহের পেছনে শিক্ষক ও ছাত্রদের হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। যেখানে মাদ্রাসার মাসিক খরচ ২০ লাখ টাকা, সেখানে চামড়া থেকে আয় হয় মাত্র চার-পাঁচ লাখ টাকা, যা দিয়ে বড়জোর এক সপ্তাহের খরচ চলে। এ কারণে তারা চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই সামান্য প্রাপ্তির জন্য কোরবানির ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে ছাত্রদের নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ‘ভিখারির মতো’ চামড়া সংগ্রহ করাকে তিনি অত্যন্ত অপমানজনক ও লাঞ্ছনাকর বলে অভিহিত করেছেন।

ঢাকার বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের থেকে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে বহু এতিমখানা ও মাদ্রাসা আর কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করে না। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ বা দরিদ্র ছেলেমেয়ের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হাজার হাজার মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো, যারা কোরবানির চামড়ার অর্থ সাহায্য হিসেবে পেয়ে থাকে। দাম না পেয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো চামড়া সংগ্রহ থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে। 

সারাদেশের চিত্র
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কুমিল্লায়ও দর নিয়ে নৈরাজ্য হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৩০০ টাকায় চামড়া কিনে ১০০ টাকা দাম না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, নগরীর লাকসাম রোডের কাসেমুল উল উলুম মাদ্রাসা সংগ্রহে থাকা বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে চামড়া ফেলে দেওয়ার অনুরোধ ধরে। তাদের অনুরোধে ময়লার গাড়ি নিয়ে প্রায় ১০ টন নষ্ট চামড়া ভাগাড়ে নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, সেখানে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে মূলধন হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। জেলার সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুখান চামড়া ৩০০ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। কিন্তু শহরে বিক্রির জন্য নিয়ে আসার পর কোনো ক্রেতা এক টাকাও দাম দিতে রাজি হয়নি। এখন আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়াই গচ্চা গেল।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, উত্তরের এ জেলায় সিন্ডিকেটের কারণে ব্যবসায়ীরা নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনছেন। বিক্রেতা মোজাহের আলী বলেন, ২২ হাজার টাকা দামের ছাগলের চামড়া এনেছি, কিন্তু তারা এখন এটি নিতেই চাচ্ছে না।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, দাগনভূঞা উপজেলায় কোনো পাইকার না আসায় শত শত চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী খুরশিদ আলম বলেন, নগদ টাকা দিয়ে চামড়াগুলো কিনেছিলাম। বিক্রির জন্য সারারাত জেগে বসেছিলাম; কিন্তু কোনো ব্যাপারী আসেনি। উপায় না পেয়ে চামড়াগুলো কাটাখালী নদীতে ফেলে দিয়েছি।
আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, তিতাস নদীতে শত শত চামড়া ভাসিয়ে দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ী হেলাল মিয়া বলেন, ১২৫টি চামড়া কিনেছিলাম লাভের আশায়। কিন্তু কোনো ক্রেতা না পেয়ে বাধ্য হয়ে ১০৫টি চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছি। আমার প্রায় ২৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

এ অবস্থার কারণ
চামড়ার বাজারের এমন হতাশার চিত্র নতুন কিছু নয়। চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে পরিবেশদূষণ কমাতে ইউরোপ ও আমেরিকার চামড়া পণ্যের বড় ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলোর লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) নামে একটি সংগঠন রয়েছে। সংগঠনটি ২০১৬ সাল থেকে চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সকল পর্যায়ে পরিবেশদূষণ কমানোর নীতি গ্রহণ করে। এ জন্য এলডব্লিউজি সনদ মান তৈরি করে, তা সরবরাহকারীদের অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করে দেয়। এ সনদ না থাকলে প্রক্রিয়াজাত চামড়া কিনছে না। ফলে বড় বাজার হারিয়ে চামড়ার রপ্তানি বাজার চীনকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এ সুযোগ নিচ্ছে চীনের ক্রেতারা। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দিচ্ছে। ফলে গত দুই দশকে ক্রমে পশু কোরবানি বাড়লেও সে পরিমাণ চামড়া তারা করছেন না। এতে একদিকে চামড়ার দাম কমেছে, প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান এ অর্থকরী পণ্য। 

অন্যদিকে, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ট্যানারি মালিক, আড়তদার এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসানের বৃত্তে বন্দি থাকলেও এই পুরো চেইন-ইফেক্টে লাভবান হচ্ছে কেবল বিদেশি ক্রেতারা, বিশেষ করে চীন।

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বিটিএর সভাপতি শাহীন আহমেদ এবারের চামড়ার দর পতনের জন্য মূলত অব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ত্রুটিকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, কোরবানির চামড়া সংগ্রহের ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দেওয়া জরুরি হলেও অনেকে তা না করায় চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে দাম কমে যায়। তিনি সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর প্রবেশপথে আড়তদারদের দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম যানজট এবং চাঁদাবাজির কড়া সমালোচনা করেন।

শাহীন আহমেদ জানান, ট্যানারি শিল্পনগরীতে ঢোকার মুখে কৃত্রিম যানজট তৈরি করে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কিছু আড়ত মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় চামড়া হাতিয়ে নিয়েছে। আর্থিক সংকটের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, চামড়া বাজারের হাজার কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে ব্যাংকগুলো মাত্র ১৬৪ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হারানো এবং একমাত্র চীনের ওপর নির্ভরশীল হওয়াকেও তিনি দর পতনের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।

হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতা টিপু সুলতান চামড়ার দর পতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে তীব্র টাকার সংকটকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের আগের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধ করছেন না, এমনকি এবারের মৌসুমেও তারা চাহিদার মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ টাকা দিয়েছেন। এই অর্থ সংকটের কারণে আড়তদাররা মাঠ পর্যায়ে চামড়া কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এ ছাড়া তিনি চামড়া সংরক্ষণের খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, লবণ, গুদাম ভাড়া এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে এখন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ। মূলত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সঠিক সময়ে পাওনা টাকা না পাওয়াই চামড়ার বাজারকে অস্থির করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন

×