ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

আসছে বাজেট :বিশেষজ্ঞ মত

পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবমুখী ও বস্তুনিষ্ঠ

পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবমুখী ও বস্তুনিষ্ঠ
×

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যে আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। জীবন-জীবিকার এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী বাজেটে উদ্যোগ ও বরাদ্দ দরকার। প্রবৃদ্ধি নিয়ে চিন্ত না করে করোনা ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জোর দিতে হবে। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় প্রণোদনা ও সহায়তা বাড়াতে হবে। সে জন্য বরাদ্দও বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। এর পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ থাকতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সর্বজনীন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এর ফলে এই দুটো ক্ষেত্রে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে দেশটি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক দিনের। ফলে সময় এসেছে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর। এক বছরেই এটা করা সম্ভব নয়। তবে আগামী বাজেট থেকেই সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ করোনার মাধ্যমেই মহামারি শেষ হচ্ছে, তা নয়। আগামীতেও এমন নতুন নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হতে পারে। তার প্রস্তুতি এখনই শুরু করা দরকার।
এরপর জোর দিতে হবে খাদ্য নিরাপত্তায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ইতোমধ্যে কৃষি খাতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। এক ইঞ্চি জমিও যাতে খালি না থাকে সেই নির্দেশনা দিয়েছেন। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও উদ্যোগ দরকার। কৃষকরা যাতে চাষে আগ্রহী হতে পারেন, সেই ধরনের উদ্যোগ থাকতে হবে। উৎপাদন, সরবরাহ ও কৃষকদের পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। বোরো ফসল ভালোভাবে ঘরে উঠেছে। আউশ ও আমনের চাষ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ধানের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন- হাঁস, মুরগি, মাছ, গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ দরকার।
সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ দরকার। ইতোমধ্যে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বাজেটে এই পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রণোদনা বা সহায়তা দিয়ে অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব নয়। এজন্য গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, বাজেটে সে ধরনের উদ্যোগ থাকতে হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশে এমন এক কোটি উদ্যোক্তা রয়েছেন। এদের রাষ্ট্রীয় সুবিধার আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া ৭০ হাজার এসএমই আছে। তাদেরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
এর পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। অর্থনীতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং সমাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন ব্যবস্থার অধিকাংশ মানুষকে সম্পৃক্ত করা ও সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উদ্যোগ দরকার। এ জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশের অগ্রগতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে রেমিট্যান্স উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অন্যান্য দেশ থেকে প্রবাসী কর্মীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সৃষ্টির উদ্যোগ থাকতে হবে। শেষ কথা হচ্ছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার উন্নয়নের মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। এখন সুযোগ এসেছে উন্নয়নে সাধারণ মানুষকে প্রাধান্য দেওয়ার। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার। এজন্য দরকার যথাযথ বাজেট বাস্তবায়ন। এ জন্য পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবমুখী ও বস্তুনিষ্ঠ। গতানুগতিক আকাশচুম্বী কোনো পরিকল্পনা নেওয়া ঠিক হবে না। এ বছর সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বাজেট করতে হচ্ছে সরকারকে। এই ভিন্নতাকে ধারণ করে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত। পরিকল্পনা ঠিকমতো করা হলে এবং তার বাস্তবায়ন হলে সাম্যভিত্তিক উন্নয়ন হবে, যার মাধ্যমে আসবে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি।
লেখক :অর্থনীতিবিদ ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান


আরও পড়ুন

×