ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আহসান এইচ মনসুর বললেন

প্রচলিত পদ্ধতিতে গভর্নর নিয়োগে ‘ইয়েস ম্যান’ পাওয়া যাবে, ইফেক্টিভ হবে না

চলতি অর্থবছরের মধ্যে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়নে নেওয়া হবে

প্রচলিত পদ্ধতিতে গভর্নর নিয়োগে ‘ইয়েস ম্যান’ পাওয়া যাবে, ইফেক্টিভ হবে না
×

ইআরএফ কার্যালয়ে ব্যাংকিং খাত সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ছবি: সমকাল

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৫:০৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলে ‘ইয়েস ম্যান’ পাওয়া যাবে। তবে ব্যাংক খাতের সুশাসনের জন্য তা ইফেক্টিভ হবে না। বিশ্বের উন্নত দেশের মতো গভর্নরকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দিলে তখন তিনি একটা অবস্থান নিতে পারেন। এজন্য প্রস্তাবিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের সংশোধনী কার্যকর করা খুব জরুরি।

বৃহস্পতিবার ইআরএফ আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে একটা ফোনেই গভর্নরকে বাদ দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে এরকম ব্যবস্থা থাকলে এতোদিনে ফেডের চেয়ারম্যান ৫০ বার বাদ পড়তেন। কেননা, ট্রাম্প ৫০ বার তাকে ফায়ার করার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চাইলেই যেন বাদ না দেওয়া যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। এমনভাবে সিলেক্ট করতে হবে যেন তাকে চাইলেই যে কোনো কিছু করানো না যায়।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে পুরানা পল্টনে ইআরএফ কার্যালয়ে ব্যাংকিং খাত সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

সেখানে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

গভর্নর আরও বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক থেকে কোনো ধরনের ধার করা হবে। নিজেদের সক্ষমতার আলোকে রিজার্ভ বাড়ানো হবে। আমরা চাপ সৃষ্টি করে ডলার কিনছি না। বাজারভিত্তিক নিলামের মাধ্যমেই ডলার কেনা হচ্ছে। অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৩৪–৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

গভর্নর বলেন, আমরা একটি খারাপ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছি। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হয়েছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা ডলার নিয়ে এখন কোনো উদ্বেগ নেই। 

তিনি স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। অনেক ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি আছে, খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আমার ধারণা ছিল খেলাপি ঋণ ২৫–২৭ শতাংশ হবে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো তথ্য লুকাবো না। যা সত্য, সেটাই প্রকাশ করবো। আশা করি এখন এটি কমবে।

ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে গভর্নর বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানত নিরাপদ থাকবে। আমানত বিমার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়া হবে। নতুন ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে সেখানে লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই।

আলোচনায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মূল কাজের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে জড়িয়েছে। ক্যাপিটাল মার্কেট কার্যকর না থাকায় ব্যাংকগুলোকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে, যার মাধ্যমে শিল্পায়নও হয়েছে। তবে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দখলের পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে মাফিয়াতন্ত্রের সূচনা হয় এবং সেখান থেকেই সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রিজার্ভ আবার বাড়ছে, ডলার বাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং বাজারভিত্তিক ডলার রেট চালুর পরও বড় ধরনের ঝাঁকুনি আসেনি। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শুধু ব্যাংকিং সংস্কার করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে মত দেন তিনি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একসময় ব্যাংকিং খাত উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নীতিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার কারণে খাতটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় বাজেটের সমান বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হতো বলে খেলাপি ঋণের হার কম দেখাত। এখন নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করায় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টসহ বিভিন্ন পদক্ষেপকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণে খাতটি আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছে। সামনে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

×