ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স
ইচ্ছা করে পানি ঘোলা করছে, শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে: গভর্নর
ড. আহসান এইচ মনসুর
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২২:৫৭
এমএফএস সেবা দাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ তুলে গভর্নরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে– এরকম কোনো এজেন্ডা পর্ষদ সভায় ছিল না। বরং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার মূল্যায়ন প্রক্রিয়াসহ ৮টি এজেন্ডার ভিত্তিতে পর্ষদ সভা করা হয়েছে। চাকরিবিধি অমান্য করে প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে এভাবে সম্মেলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আজ সোমবার রাতে টেলিফোনে সমকালকে বলেন, নির্বাচনের পর এখন ইচ্ছে করে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। সোমবারের পর্ষদ সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব পরিচালনা পর্ষদের সভায় উঠেনি। বরং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কি হবে, মূল্যায়নের অগ্রগতি কোন পর্যায়ে এসব নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, পরিচালনা পর্ষদ কি সিদ্ধান্ত নেবে না নেবে এটা পর্ষদে আলোচনার বিষয়। ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে যেসব কর্মকর্তা এটা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন (শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত শাস্তি মূলক ব্যবস্থা) নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী– কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন, সভা, সেমিনার, বক্তব্য বা বিবৃতি দেওয়ার জন্য অনুমোদন নিতে হয়। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে গভর্নর অনুমোদন দিয়ে থাকেন। তবে আজকের সংবাদ সম্মেলনে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয় দুপুর ৩টায়। এর আগে সকাল সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কেবল একটি এজেন্ডার ভিত্তিতে পর্ষদ সভা হচ্ছে কর্মকর্তারা এমন অভিযোগ করলেও ৮টি এজেন্ডার ভিত্তিতে সোমবারের সভা হয়েছে। এখানে ‘ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের লক্ষ্যে যোগ্য আবেদনকারী নির্বাচন।’ এছাড়া রিজার্ভ চুরির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের মামলা পরিচালনায় আইনজীবীর বিল পরিশোধ, কমিউনিটি ব্যাংকের আইপিও ছাড়ার সময় বৃদ্ধি, সিআইবিতে খেলাপি ঋণের তথ্য গোপনের কারণে আরোপিত জরিমানা মওকুফ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল করায় প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ওপর আরোপিত জরিমানা মওকুফের আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স কোনোভাবে যেন বিতর্কিত না হয় সে জন্য শুরু থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছে। লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে একাধিক মূল্যায়ন কমিটি করা হয়েছে। আমি নিজেও একটি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য। সোমবারের পর্ষদ সভায় লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব যায়নি। বরং মূল্যায়ন অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন কর্মকর্তারা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ লিখিত বক্তব্যে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য আহ্বান করা পর্ষদ সভা অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে। এছাড়া গভর্নরের স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া উপদেষ্টাদের চুক্তি বাতিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ–পদোন্নতিতে অচলাবস্থা দূর করা, ব্যাংকখাত নিয়ে গভর্নরের খেয়ালি বক্তব্য বন্ধ এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংক হিসেবে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
লিখিত বক্তব্য শেষে কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করে এভাবে সংবাদ সম্মেলন থেকে তারা আসলে গভর্নরের পদত্যাগ চান কিনা? এই প্রশ্নে মাসুম বিল্লাহ– কাউন্সিল গভর্নরের পদত্যাগ চাইবে এরকম বিষয় না। একজন ব্যক্তি পরিবর্তন বিষয় না। বিষয় হলো ব্যক্তির স্বচ্ছতা, স্বৈরাচারিতা, পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা।’
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আজ শুধু বিকাশকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে। বর্তমান গভর্নর অতীতে বিকাশের ৫০ শতাংশের বেশি মালিকানা থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতির পরিপন্থি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, সরকারের বেশিরভাগ উপদেষ্টা যখন বিদায় নিয়েছেন। নতুন সরকার এখনও গঠন হয়নি। এরকম সময়ে রোববারে নোটিশ দিয়ে সোমবারে কেন পর্ষদ বৈঠক ডাকা হবে। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টি জানিয়ে পর্ষদ সদস্যদের আমাদের চিঠির কপি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আপনাদের জানানো আমাদের কর্তব্য মনে করেছি। যে কারণে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে একাধিক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন– বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকখাতে ব্যাপক লুটপাট হলেও তারা চুপ থেকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। হঠাৎ করে তারা এভাবে সরব হওয়ার কারণ কি? এই প্রশ্নের জবাবে অফিসার্স কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আগে করিনি বলে এখন আপনারা প্রশ্ন তুলছেন। এখনও না বললে সামনে আবার প্রশ্ন তুলবেন। আমরা এই দায় বয়ে বেড়াতে চায় না।’
নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতো ওপেন হতাম না।’
মাসুম বিল্লাহ বলেন– ‘আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন চায়। তবে স্বায়ত্তশাসন হবে প্রতিষ্ঠানের জন্য, ব্যক্তির জন্য নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে, প্রতিষ্ঠানের প্রধান এক নায়ক হয়ে উঠবেন বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন। স্বৈরাচার হয়ে উঠার কারণেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। অফিসার্স কাউন্সিল কেবল কর্মকর্তাদের সুবিধা নিয়ে না, আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষার স্বার্থে যে কোনো কাজ করতে পারে।’
কাউন্সিল আরও জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হতে পারে না। পাশাপাশি ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বর্তমান রাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সময়ে এমন বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া আইন ও প্রথা—উভয়েরই লঙ্ঘন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে একটি একচেটিয়া বাজার তৈরির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। এর আগে এক ব্যক্তির কাছে ৭টি ব্যাংক যাওয়া নিয়ে যেভাবে প্রশ্ন উঠেছে। এখন আবার প্রশ্ন উঠবে।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ ব্যাংক
- গভর্নর
- বিকাশ
