তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমলো ৮৭ হাজার কোটি টাকা
ছবি-সংগৃহীত
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ | ২২:৩২
লাফিয়ে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম এসেছে। বিশেষ পুনঃতপশিল ও আদায় জোরদারের ফলে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। মোট ঋণের যা প্রায় ৩১ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। অবশ্য গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক বছর আগের তুলনায় ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনিয়ম জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেকে পালিয়েছেন। কেউ কেউ জেলে আছেন। বিগত সরকারের সময়ে নীতি সহায়তার আড়ালে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া হতো। আবার নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি রেখেও লভ্যাংশ ঘোষণা করা যেতো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ি করা হয়। একদিকে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে এসেছে, আরেক দিকে নিয়ম করা হয়েছে সঞ্চিতি ঘাটতি রেখে ২০২৫ সালের জন্য কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। যে কারণে বিশেষ সুবিধায় পুনঃতপশিল বা আদায় জোরদার করেছে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বিপুল অংকের এ খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা। তবে রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। এতে করে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা প্রয়োজনের বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। এর মানে তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি কমেছে এক লাখ ৫২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একের পর এক সুবিধার কারণে ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। সাম্প্রতিক কঠোরতার কারণে সেই পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের স্বার্থে এখন নির্বাচিত সরকারও এসব কঠোরতা বজায় রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন গভর্নর কর্মকর্তাদের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন। আজ সব বিভাগের পরিচালকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গভর্নর বলেন, বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ব্যবসার খরচ কমানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ কলকারখানা চালুতে নীতি সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিল ব্যবস্থা চালু হয়। এর পর থেকে নানা শিথিলতায় খেলাপি ঋণ কম দেখানো হচ্ছিল। এক্ষেত্রে কখনো ঋণ পরিশোধ না করেই নিয়মিত রাখা, নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পুনঃতপশিল কিংবা ভুয়া ঋণ নিয়ে দায় সমন্বয়েরও সুযোগ দেওয়া হতো। খেলাপি ঋণ কম দেখাতে সবচেয়ে বড় চুরির সুযোগ দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। সাধারণভাবে ঋণ পরিশোধের সময় পার হলেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হয়। তবে ২০১৯ সালে এক নির্দেশনার মাধ্যমে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের ৬ মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হচ্ছিল।
