ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে

দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়াচ্ছে। লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা রপ্তানি সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের সার্বিক অবস্থা উত্তরণে একটি দক্ষ এবং সমন্বিত লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে। 
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এমন মত দেন। ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আলোচনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বিশেষ অতিথি ছিলেন। ঢাকা চেম্বারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। 

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী বলেন, লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময়, সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহনে ধীরগতি এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতার কারণে সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ব্যয়বহুল ও মন্থর করে তুলছে। 

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বন্দরগুলোতে পেপারলেস অটোমেটেড ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পিপিপির মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগের একটি দক্ষ ও টেকসই লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে। 
বিআইএমের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে, যা ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় ক্রমাগত বাড়াচ্ছে। এ খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার ওপর তিনি জোরারোপ করেন।    

মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫%, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে। জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান বাড়াতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও জোর দিতে হবে। 
তিনি উল্লেখ করেন, গত চার দশকে বাংলাদেশের রপ্তানিতে আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও রপ্তানি গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বাণিজ্যবিষয়ক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিবিষয়ক সংস্কার ও যুগোপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ না থাকার পেছনে দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় অন্যতম কারণ। 

মাসরুর রিয়াজ বলেন, লজিস্টিকস খরচ ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি ২০ শতাংশ বাড়বে। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে লজিস্টিকস নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের সময়সীমা কমানো এবং সরকারি সহায়ক একান্ত অপরিহার্য। তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে আমাদের সক্ষমতা নেই। ব্যবসা ও বিনিয়োগের সার্বিক অবস্থা উত্তরণে একটি দক্ষ এবং সমন্বিত লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম নিশ্চিতের ওপর তিনি জোর দেন।

নির্ধারিত আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্তি সচিব মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক, আইআইএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলসের এমডি এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ, এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী অংশ নেন। 

মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে সম্প্রসারণের তেমন সুযোগ নেই। তাই রেলপথ একমাত্র ভরসা। বন্দরের সঙ্গে রেলপথের সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে স্বল্প সময় ও ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়। তিনি দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর অন্তত একটি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাব দেন।    
ড. মো. শামসুল হক বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবভিত্তিক না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ অবকাঠামো থেকে ইতিবাচক ফল পেতে হলে অবশ্যই সমন্বিত হতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মত দেন। 

এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, স্ক্যানার মেশিন না থাকার কারণে উদ্যোক্তারা পানগাঁ বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অভ্যন্তরীণ নদীপথের অবকাঠমোর স্বল্পতার কারণে শিল্প খাতের পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে। 
নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনও সহজীকরণ এবং আধুনিকায়ন করা হয়নি। স্থল বন্দরগুলোর কার্যক্রম ডিজিটাল করা যায়নি। ফলে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। 
এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং ‘মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব’ প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করে যাচ্ছে। লজিস্টিকস সেবার সব স্তরে ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিতের ওপর তিনি জোর দেন। 

আরও পড়ুন

×