ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্মের যাত্রা, মালিকানায় ৩৯ ব্যাংক

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্মের  যাত্রা, মালিকানায় ৩৯ ব্যাংক
×

বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির প্রথম তহবিল ‘অঙ্কুর বাংলাদেশ ফান্ড ১’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, বিএবির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বিএসআইসির চেয়ারম্যান মা

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

উদ্ভাবনী উদ্যোগ তথা স্টার্টআপ তহবিলে মূলধন বিনিয়োগের জন্য দেশের ৩৯টি ব্যাংকের উদ্যোগে প্রথম পরিচালিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। দীর্ঘদিন বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল স্টার্টআপ খাতের জন্য প্রথমবারের মতো দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠিতভাবে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (বিএসআইসি) পিএলসির মাধ্যমে এ তহবিল পরিচালিত হবে। 
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম তহবিল ‘অঙ্কুর বাংলাদেশ ফান্ড ১’-এর উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বিএসআইসির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। অনুষ্ঠানে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী, সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান, ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্মের পরিশোধিত মূলধন ৪২৫ কোটি টাকা (প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার)। বাংলাদেশ ব্যাংক স্টার্টআপ তহবিলকে উৎসাহিত করতে ২০২২ সালে এক নির্দেশনার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংকের নিট মুনাফার ১ শতাংশ আলাদা করে রাখার নির্দেশ দেয়। সেই তহবিল দিয়েই এখন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠন হয়েছে। এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগে মূলধন বিনিয়োগ করবে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের মুনাফার অংশ পাবে এই কোম্পানি। আবার অংশীদার ব্যাংকগুলো প্রতিবছর তাদের নিট মুনাফার এক শতাংশ এখানে দেবে। ফলে এটি কোনো এককালীন তহবিল নয়; বরং একটি ধারাবাহিক মূলধন কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। ফান্ডটি সিড, লেট-সিড এবং সিরিজ-এ পর্যায়ের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে সম্ভাবনাময় যেসব স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের বয়স দুই বছরের কম, সেখানে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। কোম্পানির বয়স দুই থেকে ছয় বছরের মধ্যে থাকলে পাঁচ কোটি টাকা এবং ছয় থেকে ১২ বছর হলে আট কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি কোনো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে পারবে না। তবে ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব উৎস কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকে বিদ্যমান ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুদহার হবে ৪ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আর্থিক খাতসহ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক খাতে সরকারের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ বা প্রভাব এখানে কাজ করবে না। এটি হবে শতভাগ পেশাদার প্রতিষ্ঠান। ভবিষ্যতে এই কোম্পানির তহবিল আরও বাড়বে। এটি কেবল একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দেশের সামগ্রিক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে দৃশ্যমান করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের প্রধান দুটি সমস্যা হলো তহবিলের অভাব এবং জামানত দেওয়ার অক্ষমতা। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দুটি বাধা দূর হচ্ছে। এখানে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দক্ষ এবং পেশাদার।

আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা পুঁজিবাজারের সংস্কার এবং সিরিয়াস ডিরেগুলেশনের দিকে এগোচ্ছি। বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জন্য দক্ষ ব্যক্তিদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। দেশের ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের মূলধন ঘাটতি দূর করতে আমরা কাজ করছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই উদ্যোগটি আমাদের রাজনৈতিক ইশতেহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহরের তরুণদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা হবে। তিনি বলেন, এই স্টার্টআপ কোম্পানিটি শুধু ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের সফলতার জন্য সব ধরনের নীতি সহায়তা দেবে। অনেকগুলো ব্যাংক একসঙ্গে মিলে এই ভেঞ্চার ক্যাপিটালের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এসআইসি দেশীয় পুঁজিকে উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা খাতে প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী হবে।

মাসরুর আরেফিন বলেন, বিএসআইসি শুধু একটি তহবিল নয়; এটি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম– যা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের স্বপ্নকে পেশাদার ও সুশৃঙ্খল মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো আরও শক্তিশালী সুশাসন, উন্নত অর্থায়ন এবং বিশ্বাসযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ মাধ্যমের অংশীদারিত্বের সুযোগ পাবে।
বিএসআইসি জানিয়েছে, ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই প্রথম তিনটি বিনিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একজন প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা এবং পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ কমিটি নিয়োগ ও গঠন করা হবে। অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অঙ্গনের অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বি ক্যাপিটালের সাবেক জেনারেল পার্টনার সামি আহমদকে বিএসআইসি বোর্ডের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ৪৫০টিরও বেশি বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থায়ন এসেছে। তবে এর মধ্যে ৭ শতাংশেরও কম এসেছে দেশীয় উৎস থেকে।

আরও পড়ুন

×