ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে

বাজেট নিয়ে প্রথম আলোর গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে
×

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পিপিআরসির চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমসহ অন্যরা ফটাে রিল

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের ভঙ্গুর দশা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকারকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর দিতে হবে। আবার দীর্ঘদিন পর প্রকৃত নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মানুষের স্বস্তি এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট করতে হবে। 
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়ােজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অলিগার্ক বা গুটিকয়েক সুবিধাভোগীর নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি নাগরিক যাতে সুফল পায় এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার। এমন নীতি গ্রহণ করা হবে যাতে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রত্যেকে সুবিধা পায়। 

তিনি বলেন, প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়া। এ কারণে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এ সমস্যার সমাধানে একটি সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রতি ক্ষেত্রে ডিরেগুলেশন করা হবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। 
রেস্তোরাঁ খাতের এক ব্যবসায়ীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ব্যবসার জন্য ১৩ ধরনের অনুমোদন যেন এক জায়গা থেকে নেওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করা হবে। আবার রাজস্ব আদায়ের নামে রেস্তোরাঁ মালিকরা যেন হয়রানির শিকার না হন সেজন্য একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড থেকে ঋণ প্রসঙ্গেও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধনি কোম্পানির জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। কর ফাঁকি বন্ধের জন্য কার কত মার্কেট শেয়ার এবং কে কত টাকার কর দিচ্ছে তা যাচাই করা হবে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীলতার জন্য মূল্যস্ফীতি, সুদহার ও বিনিময় হার এই তিনটি ধ্রুবতারা রয়েছে। আমার বিবেচনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য ধরা উচিত হবে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমাতে হবে।’
তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে ফেরানোর জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোয় একটি নোঙর প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি হবে অন্যতম নোঙর। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি কোনোভাবেই মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ শতাংশের ওপর যাওয়া ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, বছরের বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্য মন্ত্রী দিয়েছেন, তা অর্জনে নতুন ক্ষেত্রে করজাল বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর আরোপের পক্ষে মত দেন তিনি।
পিপিআরসির চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘দেশে আর্থিক সংকট আছে, নিম্ন রাজস্ব আয়ের মধ্যে আমরা আছি। জ্বালানি নিয়েও একটা সংকট দেখলাম। তবে সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার সংকট। বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে আস্থা ফেরাতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষকে নিয়ে দুই বছর মেয়াদি একটি অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক করা যেতে পারে।’
তিনি বলেন, আমরা এখন ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থায় নেই। মানুষ খাবার পাচ্ছে না এমন হচ্ছে না। তবে কোনোভাবেই আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। দেশে সরাসরি লুট, নীত প্রণয়ন, ফাঁকি এবং হয়রানি এই চার উপায়ে দুর্নীতি হয়। এসব সমাধান করতে হবে।

বিআইজিডির প্রফেসরিয়াল ফেলো ড. সেলিম জাহান বলেন, বাজেটে মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। তবে এই স্বস্তির মানেই যে বিশাল আকারের বাজেট– তেমন না। বরং সেবামূলক কাজে মানুষের প্রবেশাধিকার সহজ করতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর জায়গায় এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুনরুদ্ধার ও সহনশীলতা বাড়াতে হবে। পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আমাদের অর্থনীতি এখনও
প্রস্তুত না।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বন্ধ কারখানা সচল করার চেয়ে, সচল কারখানা যেন বন্ধ না হয় সে দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার মুনাফা করতে না পারলেও অগ্রিম কর নিয়ে যাচ্ছে। পরে যা সমন্বয় করা হয় না।
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, করজাল বাড়াতে হবে। একই স্বচ্ছতার সঙ্গে কর আদায় করতে হবে। আর্থিক খাতে সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।

আরও পড়ুন

×