পিপিআরসির ওয়েবিনারে বক্তারা
অপরিকল্পিত স্থানান্তরের কারণে চামড়াশিল্প ধ্বংসের মুখে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন ৬০ শতাংশ হলেও চামড়া খাতে তা ৯০ শতাংশের বেশি হওয়া সম্ভব। অথচ একদিকে মূল্য না পেয়ে মানুষ চামড়া ফেলে দেয়, অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে চামড়া আমদানি করেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?’ শীর্ষক ওয়েবিনারে আলোচকরা এমন তথ্য দেন। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় গতকাল শনিবার ওয়েবিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের চামড়া খাতের সংকটকে ‘আত্মঘাতী’ এবং হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরকে একটি ‘অসম্পূর্ণ স্থানান্তর’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, বুড়িগঙ্গা বাঁচানোর নামে যে স্থানান্তর হয়েছে, তাতে বুড়িগঙ্গাও বাঁচেনি, উল্টো ধলেশ্বরী নদীও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সংকট উত্তরণের জন্য তিনি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে অসম্পূর্ণ স্থানান্তর প্রক্রিয়া আগামী এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি শেষ করার সুপারিশ করেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। চামড়া খাতে তা ৯০ শতাংশের বেশি সম্ভব। কারণ চামড়া এ দেশেই মিলছে। বিশ্ববাজারে এ খাতের ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার থাকলেও বাংলাদেশ বর্তমানে মাত্র এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করছে।
এ খাতের বর্তমান অবস্থাকে পশ্চাদগমন অভিহিত করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের প্রাক্কলন ভুল ছিল। যেখানে ২৫ হাজার কিউসেক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দরকার ছিল, সেখানে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার কিউসেকের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। ফলে বুড়িগঙ্গার পর এখন ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। ২০০ কোটি টাকার সিইটিপি প্রজেক্ট এক হাজার ২০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকলেও এখনও বৈশ্বিক মান অর্জন করা যায়নি। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩০ সালের মধ্যে চামড়া পণ্যের ওপর কার্বন ট্যাক্স বসাবে। এ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক দেশে শূন্য শুল্ক সুবিধা হারাবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গেল কোরবানির ঈদে প্রায় ৯০ লাখ পশু কোরবানি হলেও ছাগল ও খাসির চামড়ার ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটেছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের সময় ছাগলের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশেষায়িত ৩০টি কারখানার মধ্যে মাত্র ছয়টি সচল হতে পেরেছে। বাকি ২৪টি নিষ্ক্রিয়।
ঈদের পশুর চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার আরও কারণ ব্যাখ্যায় শাহীন আহমেদ বলেন, ২০১৭ সালের আগে কোরবানির মৌসুমে ব্যাংকগুলো প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ দিত। এখন মাত্র ৬৫ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থ সংকটের কারণে ট্যানারি মালিকরা আড়তদার ও প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থ অগ্রিম দিতে পারছেন না, যা মাঠ পর্যায়ে চামড়া কেনাবেচায় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার রপ্তানিকারক সমিতির চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের সিইটিপি প্রকল্পে ইউরোপীয় মানের পরিবর্তে নিম্নমানের চায়নিজ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া এর ধারণক্ষমতা ও প্রক্রিয়াকরণ সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী না হওয়ায় এটি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি পায়নি, যা রপ্তানি বাধার প্রধান কারণ।
ওয়েবিনারে জেনিস সুজের চেয়ারম্যান নাসির খান বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই চামড়া খাতকে বাঁচাতে পারত। পরিকল্পনা ছাড়াই ২০১৭ সালে হুট করে হাজারীবাগের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এ শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পরপরই কলকাতায় নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন খোলা হয়েছিল।
কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, শুধু অর্থায়ন নয়; বরং সিইটিপি ও কমপ্লায়েন্সের সমস্যা কাটাতে শিল্প মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভার আয়োজন করা প্রয়োজন।
- বিষয় :
- ওয়েবিনার
