স্ট্যাম্প শুল্কে জালিয়াতি রোধে বিশেষ উদ্যোগ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্ট্যাম্প শুল্ক আদায়ে জালিয়াতি বন্ধ, রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত এবং পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুলাই থেকে আংশিক এবং পরবর্তী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে দেশের সব ধরনের স্ট্যাম্প শুল্ক বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনভিত্তিক ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে কাগজের ও আঠালো স্ট্যাম্পের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো স্ট্যাম্প শুল্ক আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ করা।
বর্তমানে ১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের আওতায় আঠালো (অ্যাডহেসিভ) ও পেপার (ইমপ্রেসড) স্ট্যাম্পের মাধ্যমে শুল্ক আদায় করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে জাল স্ট্যাম্প তৈরি, নকল কাগজ ব্যবহার এবং হিসাবের অমিলের মতো নানা সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি স্ট্যাম্প মুদ্রণ, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা এবং সারাদেশে বিতরণ প্রক্রিয়াও ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী স্ট্যাম্প শুল্ক থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও জালিয়াতির কারণে প্রত্যাশিত আয় অর্জিত হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আদায় হয়েছে তিন হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আদায় হয়েছে মাত্র এক হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
এ-চালানের মাধ্যমে আদায়ের খসড়া প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরের অন্তর্বর্তী সময়ে বীমা স্ট্যাম্পসহ সব ধরনের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক এ-চালান ও প্রচলিত কাগজ– উভয় পদ্ধতিতে পরিশোধ করা যাবে। তবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে কেবল এ-চালানের মাধ্যমেই স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক হবে।
নতুন ব্যবস্থায় শুল্ক পরিশোধের পর পাওয়া চালানের রসিদের একটি মুদ্রিত কপি মূল দলিলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দলিলের প্রথম পাতায় সংশ্লিষ্ট এ-চালান নম্বর উল্লেখ করতে হবে। স্ট্যাম্প পেপারের পরিবর্তে সাধারণ কার্টিজ পেপার বা আইন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত লিগ্যাল কাগজ ব্যবহারেরও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যক্তির পক্ষে একযোগে শুল্ক পরিশোধ করতে চাইলে চালানে সংশ্লিষ্ট সবার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন বা বিআইএনের মতো শনাক্তকরণ নম্বর আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা নতুন ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানান। নিবন্ধন অধিদপ্তর জানিয়েছে, দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শুল্কের অর্থ ‘অন হোল্ড’ রাখার ব্যবস্থা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কোনো কারিগরি সমস্যা নেই। আরজেএসসি জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে কোম্পানি নিবন্ধন ও শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত শুল্ক সফলভাবে এ-চালানের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ-চালানের মাধ্যমে বীমা স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের মতে, নতুন ব্যবস্থার ফলে জাল স্ট্যাম্প তৈরি ও ভুয়া চালানের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। একই সঙ্গে স্ট্যাম্প মুদ্রণ, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় কমবে, কাগজের ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং চালানের রসিদ কিউআর কোড বা অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক পরিশোধের সত্যতা যাচাই করা হবে।
- বিষয় :
- শুল্ক
