ইসলামী ব্যাংকে দ্বিতীয় দিনেও অস্থিরতা কাটেনি
নতুন চেয়ারম্যানের স্ত্রী ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের খেলাপি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অস্থিরতা কাটেনি। গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের শাখার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছে। চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ সাত দফা দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গ্রাহক ফোরাম। এদিকে আগের দিন রাতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি ছাড়া ভার্চুয়াল মাধ্যমে পর্ষদ সভার আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে পুলিশের সতর্ক অবস্থান থাকলেও কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। আন্দোলনকারীরা ব্যাংকের উল্টো পাশের রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। আর পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য ইসলামী ব্যাংকের প্রধান গেটসহ সামনে অবস্থান নেন।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন সমকালকে বলেন, মঙ্গলবার স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের কার্যক্রম চলেছে। আন্দোলনের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
গতকাল দুপুর ১২টায় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরু নবী মানিক। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে– খুরশীদ আলমের পদত্যাগ, ওমর ফারুক খানকে এমডি পদে পুনর্বহাল, লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কাউকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে না রাখা, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল, এস আলমের দেশি-বিদেশি সম্পত্তি বিক্রি করে লুট করা অর্থের সমন্বয় করা, এস আলম যাতে কোনো ব্যাংকেই ফিরতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া এবং সব ব্যাংক লুটকারীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। এসব দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এসব দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের গত সোমবার গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান তারা। গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক নুরু নবী মানিক বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীল পদে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। আমানতকারীর আমানত রক্ষার দায়িত্ব পালনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যর্থ হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনেকে টাকা তুলতে পারছেন না।
চেয়ারম্যান নন, ঋণখেলাপি তাঁর স্ত্রী
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম ঋণখেলাপি– এমন একটি খবর গতকাল ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালকের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন চেয়ারম্যান খেলাপি নন। তাঁর স্ত্রী একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খুরশীদ আলমের কোনো সম্পৃক্ততা নেই ।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খুরশীদ আলমের গৃহিণী স্ত্রী আফরোজা আক্তার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক নির্বাহী পরিচালক জামাল মোল্লার স্ত্রী আলিয়া খানম চৌধুরীর নামে এগ্রোকর্প লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক থেকে ২০১৬ সালে ঋণ নেওয়া হয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণের পুরোটাই এখন মন্দমানে শ্রেণীকৃত। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির নামে মেঘনা ব্যাংকে ৭৭ লাখ টাকা ঋণ ‘এসএমএ’ মানে শ্রেণীকৃত।
ভার্চুয়াল সভার আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন
গত সোমবার রাত ১০টার দিকে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের একটি সভা হয়েছে এমন খবর দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। যেখানে ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার ইসলামী ব্যাংক থেকে একই তথ্য জানিয়ে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এই ভার্চুয়াল সভা আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে গতকাল প্রশ্ন তোলেন আন্দোলনকারীরা। এভাবে সভা করা নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভেতরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পর্ষদ সভা আয়োজনে কিছু নিয়ম রয়েছে। বিশেষ করে পর্ষদ সভার জন্য একটি নোটিফিকেশন দিতে হয়। সে আলোকে পর্ষদের সচিব সদস্যদের কাছে আলোচ্যসূচি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সভার আলোচনার বিষয় লিপিবদ্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। ব্যাংকের কর্মকর্তারাই এসব করে থাকেন।
ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ভার্চুয়াল সভা আয়োজন বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। আবার এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র কীভাবে গ্রহণ হলো সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা, গত ২৪ মে এমডি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে পদত্যাগপত্র দিয়ে যান। ওই সময় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়নি। এর পর পর্ষদের কোনো সদস্য ব্যাংকে যাননি। ফলে কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কীভাবে তা গ্রহণ হবে?
- বিষয় :
- ইসলামী ব্যাংক
