বাজেট ২০২৬-২৭
জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচায় বাড়ছে করের বোঝা
আনোয়ার ইব্রাহীম
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থাবর সম্পত্তি বা জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা বা লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে কর নির্ধারণে বড় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, আগামী অর্থবছর থেকে ডেভেলপারকে জমি দেওয়ার বিনিময়ে মালিক নগদ টাকা, ফ্ল্যাট বা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত ভাড়া সুবিধা বা আর্থিক মূল্য আছে– এমন যে সুবিধাই নেবেন, তার আর্থিক মূল্য ধরে ১৫ শতাংশ হারে ‘ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স’ বা মূলধনি মুনাফা কর দিতে হবে।
জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে আগে উৎসে কেটে নেওয়া করই ছিল চূড়ান্ত কর দায়। অর্থমন্ত্রীর কর প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে তা অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি জমি অধিগ্রহণ বাবদ সরকার ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা দেবে, তার ওপর উৎসে কর কাটবে। কেটে নেওয়া ওই করও কেবল অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর আয়কর রিটার্নে ওই আয় প্রদর্শন করে মোট আয় হিসাব করতে হবে এবং প্রযোজ্য কর ধাপে নির্ধারিত হারে কর দিতে হবে। অবশ্য কর ধাপ অনুযায়ী, বেশি কর কেটে নেওয়া হলে তার ‘রিফান্ড’ বা ফেরতও চাওয়া যাবে। তবে আয় বেশি হলে বেশি হারে কর দিতে হবে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আয়কর আইনের এ পরিবর্তনের ফলে করভার বাড়বে। বিশেষত করদাতা উচ্চ কর ধাপের হলে, তার করের বোঝা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।
ডেভেলপারকে জমি দিলে কর কত
প্রস্তাবিত অর্থ বিলের ৫৮(৩) ধারা এবং ৫ম তপশিলের অংশ-৩ এ ডেভেলপার বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছ থেকে জমি বা স্থাপনার মালিক কর্তৃক প্রাপ্ত নগদ অর্থ, ফ্ল্যাট বা অন্য যে কোনো সুবিধার ওপর মূলধনি মুনাফা কর গণনার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফাজনিত কর গণনার সূত্রটি হলো চুক্তি অনুযায়ী ডেভেলপার থেকে প্রাপ্ত ‘সাইনিং মানি’ এবং ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সুবিধার মোট বাজারমূল্য থেকে জমিটির আদি অর্জন মূল্য বাদ দিয়ে যা থাকবে তার ১৫ শতাংশ।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া এর সহজ উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরা যাক এক ব্যক্তি এক খণ্ড জমি ডেভেলপারকে দেওয়ার জন্য চুক্তি করলেন। বিনিময়ে তিনি ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে ৫০ লাখ টাকা পেলেন। ভবন নির্মাণের পর পেলেন দুটি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিনি পেলেন ২ কোটি টাকা। এখন জমির মালিক যদি ওই জমি ৮০ লাখ টাকায় কিনে থাকেন, তাহলে নিট মূলধনি মুনাফা হবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে তাঁকে এর ১৫ শতাংশ বা ১৮ লাখ টাকা কর দিতে হবে। যদি কোনো জমির মালিক চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট পাওয়ার আগে বাড়ি ভাড়া নেন এবং প্রাপ্য ফ্ল্যাট বিক্রি করেন, সেক্ষেত্রে কর কীভাবে হিসাব করতে হবে, সে উদাহরণও দিয়েছেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
তিনি বলেন, ধরুন আবিদ নামে একজন ব্যক্তি তাঁর পাঁচ কাঠা জমি ডেভেলপারকে ভবন নির্মাণের জন্য দিলেন। চুক্তির শর্তানুসারে তিনি পেলেন ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি, ফ্ল্যাট নির্মাণ চলাকালে তিন বছরের জন্য মাসিক ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া। ভবন নির্মাণ শেষে পেলেন প্রতিটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি ফ্ল্যাট।
চুক্তি চলাকালীন প্রতিবছর প্রাপ্ত ভাড়ার ওপর আবিদকে ১৫ শতাংশ হারে মূলধনি মুনাফা কর বছরে ৬৩ হাজার টাকা দিতে হবে। পরে যখন তিনি ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন, তখন তাঁকে একবারে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এ ছাড়া তিনি যদি পরবর্তী বছর ফ্ল্যাটগুলো বেশি দামে বিক্রি করেন, তবে বর্ধিত মুনাফার ওপর আবার ১৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে।
অপ্রদর্শিত মূল্যের ওপর অতিরিক্ত কর
আগের বছরগুলোতে জমি বা ফ্ল্যাটে কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ রেখেছিল সরকার। তবে এবার তা ভিন্নভাবে রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দলিলে কম মূল্য দেখানো হয়, তবে বিক্রেতাকে সেই বাড়তি বা অপ্রদর্শিত মূল্যের ওপর প্রযোজ্য হারে মূলধনি মুনাফা কর দিতে হবে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, যদি কোনো জমির দলিলের মূল্য ১০ লাখ টাকা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ১৩ লাখ টাকায় বিক্রি করে থাকেন, তবে ওই ৩ লাখ টাকা হবে অপ্রদর্শিত আয়। যদি করদাতা উচ্চ কর হারের (৩০ শতাংশ) আওতায় থাকেন, তবে তাঁকে এই ৩ লাখ টাকার ওপর ৯০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর করদাতা নিজে এমন আয় ঘোষণার আগেই যদি কর কর্তৃপক্ষ এটি উদ্ঘাটন করে, তবে ওই কর ছাড়াও তাঁর ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানা বা বাড়তি কর আরোপ করা হবে।
অন্যান্য পরিবর্তন
অনেকে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্থাপনা লিজ বা ভাড়া দেওয়ার সময় বড় অঙ্কের নিরাপত্তা জামানত নিয়ে থাকেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, যদি ব্যাংক বা নগদে জামানত নেওয়া হয় এবং তা বছর শেষে মালিকের কাছে থাকে, তবে সেই মোট জামানতের ১০ শতাংশ হারে প্রতিবছর ‘বিশেষ ভাড়া আয়’ হিসেবে মালিকের আয়ের সঙ্গে যোগ হবে।
সরকারি বা কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জমি অধিগ্রহণের ফলে মালিক যে ক্ষতিপূরণ পান, এখন থেকে তার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হবে। আগে এটি অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন থেকে এটি আর চূড়ান্ত কর থাকবে না। অর্থাৎ বছর শেষে করদাতার নিয়মিত আয়ের সঙ্গে এটি যোগ হবে এবং সাধারণ হারে কর মূল্যায়ন হবে।
- বিষয় :
- জমি
