বাজেট ঘাটতি মেটাতে ইসলামী বন্ড
ফাইল ছবি
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৩
সেতু নির্মাণে সুকুক বা ইসলামী বন্ড ইস্যু করবে সরকার। বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রথাগত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শরিয়াহভিত্তিক ও বৈচিত্র্যময় অর্থায়নের দিকে যাওয়ার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীন নির্মিত এবং নির্মাণাধীন সেতু ও অবকাঠামোর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুকুক ইস্যু করা হবে।
সম্প্রতি অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সরকারি ঋণের ভারসাম্য রক্ষা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সচল রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এ বিষয়ে বলেছেন, বন্ড ইস্যু সরকারের জন্য অর্থ সংগ্রহের একটি বিকল্প উপায় হলেও শেষ পর্যন্ত তা ঋণেরই একটি ধরন। এ উদ্যোগ রাজস্ব সংকটের স্থায়ী সমাধান নয় এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মূল লক্ষ্য থেকে সরকারের মনোযোগ সরে যাওয়া উচিত হবে না। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, সুকুকে কারা বিনিয়োগ করছে, তার ওপর নির্ভর করবে ব্যাংক-নির্ভরতা আদৌ কমবে কিনা।
সভায় অর্থ সচিব জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক ঋণের ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাংক থেকে সরকার অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য জোগান সংকুচিত এবং বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে একদিকে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।
সভায় অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ২০২০ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক ইস্যু করছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। এসব অর্থ বড় অবকাঠামো প্রকল্প, নিরাপদ পানি সরবরাহ, শিক্ষা খাতে এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর বেশির ভাগই ‘নন-ট্রেডেবল’, অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এগুলো বিক্রি করা যায় না। তবে সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি ট্রেডেবল বা লেনদেনযোগ্য সুকুক ইস্যু করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্পদ বা অবকাঠামোর অর্থনৈতিক উপযোগিতার বিপরীতে সুকুকধারীদের মুনাফা দেওয়া হয়। সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের চেয়ে এ মুনাফা কিছুটা কম হয়ে থাকে। সম্পদভিত্তিক হওয়ায় সুকুক তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুকুকে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ (এসএলআর) পূরণ করতে পারে। একসঙ্গে ইসলামী বন্ড হওয়ায় সুকুক সাধারণ মানুষও কিনে থাকে।
সভায় জানানো হয়, সুকুক সাধারণত দুই ধরনের– ‘অ্যাসেট-ব্যাকড’ ও ‘অ্যাসেট-বেজড’। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর কারণে সরকার মূলত সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর না করে এর ব্যবহারজনিত অর্থনৈতিক উপযোগিতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ‘অ্যাসেট-বেজড’ সুকুক ইস্যু করে। বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর বিপরীতেও সুকুক ইস্যু হচ্ছে। তবে প্রকল্পের সম্ভাব্য আয় সঠিকভাবে নিরূপণ না করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের সম্পদের মূল্যায়ন হবে
সভায় বলা হয়, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো সুকুক ইস্যুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদভিত্তি হতে পারে। এর আগে সচল ও নির্মাণাধীন সব অবকাঠামোর তালিকা, আয়-ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হবে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুকুক ইস্যু করা যেতে পারে।
সেতু কর্তৃপক্ষের সম্পদের বিপরীতে সুকুক ইস্যুর জন্য ‘ইজারা-ওয়াকালা’ মডেলকে সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় সম্পদের ভাড়া বা ব্যবহার থেকে আয় সৃষ্টি হবে এবং নির্দিষ্ট এজেন্ট বিনিয়োগকারীদের পক্ষে তা পরিচালনা করবে।
সভায় জানানো হয়, এতে সরকারের ওপর নতুন করে কোনো সরাসরি দায় সৃষ্টি হবে না এবং সম্পদের মালিকানাও সরকারের কাছে থাকবে। সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকল্পগুলোর জন্য অতীতে নেওয়া ঋণগুলোও অন-লেন্ডিং প্রকৃতির ছিল এবং কোনো সম্পদ বন্ধক রাখা হয়নি। ফলে নতুন সুকুক ইস্যুতে আইনি জটিলতার আশঙ্কা কম।
সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে– সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত ও নির্মাণাধীন অবকাঠামোর ব্যবহারজনিত অর্থনৈতিক উপযোগিতার বিপরীতে সুকুক ইস্যু করা হবে। প্রয়োজনীয় আইনি দলিল, চুক্তিপত্র ও ডকুমেন্টেশন তৈরির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হবে। মানসম্মত সম্পদ নির্বাচন করে পর্যায়ক্রমে সুকুক বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থ সচিব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন।
বিশেষজ্ঞরা যা জানালেন
সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, সুকুক একেবারে নতুন কিছু নয়। সরকার আগেও বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে সুকুক ইস্যু করেছে। এটি মূলত ঋণেরই একটি ধরন। প্রচলিত ঋণের সঙ্গে সুকুকের পার্থক্য হলো, এটি একটি নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং সেই প্রকল্প থেকে অর্জিত আয় বা রিটার্নের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পান।
তাঁর মতে, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক-নির্ভরতা কমবে কিনা, নির্ভর করবে সুকুক কারা কিনছে তার ওপর। যদি ব্যাংকগুলোই প্রধান ক্রেতা হয়, তাহলে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। তবে পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বিভিন্ন ট্রাস্ট ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে সরকারের অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় হবে। তিনি আরও বলেন, সুকুক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই কম। এমনকি অনেক শিক্ষিত মানুষ এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। তাই ব্যাপক প্রচার ও জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এমএ রাজ্জাক সমকালকে বলেন, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিপরীতে সুকুক ইস্যুর উদ্যোগ একটি উদ্ভাবনী ধারণা। এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ কিছুটা কমতে পারে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বন্ড বাজার এখনও যথেষ্ট পরিণত নয়। তা ছাড়া সুকুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলেও তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য ঋণই। বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দিতে হবে এবং ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা ছিল, এমন অর্থ বন্ডে চলে গেলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
ড. রাজ্জাক বলেন, সুকুকসহ এ ধরনের উদ্যোগ সহায়ক বা সম্পূরক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু এগুলো কখনোই এনবিআরের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির বিকল্প নয়। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করা। তিনি আরও বলেন, সুকুক বা বন্ড ইস্যুর মতো উদ্যোগ নিতে গিয়ে যদি সরকারের মনোযোগ মূল কাজ অর্থাৎ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিক থেকে সরে যায়, তাহলে তা ভালো নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে না।
