ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক নয়, পথপ্রদর্শক হবে কমিশন: বিএসইসি চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক নয়, পথপ্রদর্শক হবে কমিশন: বিএসইসি চেয়ারম্যান
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০১:০৪

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কেবল কঠোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, বরং একটি ‘সহায়ক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন সংস্থার চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কমিশন এখন আর কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়ভার বহন করবে না এবং প্রতিটি অংশীজনকে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারের বক্তব্য দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) নবগঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সম্মানে এই ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পুঁজিবাজারের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, বিএসইসি এখন থেকে সমাধানমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোবে।

মাসুদ খান তার করপোরেট ও বেসরকারি খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, আমি আপনাদেরই একজন এবং আমি জানি আপনাদের দুঃখ ও যন্ত্রণার জায়গাগুলো কোথায়। তিনি পুঁজিবাজারের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ঘোষণা দিয়ে জানান, এখন থেকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে আর তিন মাসের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে না, বরং গ্রাজুয়ালি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ছয় মাসের রিপোর্টিং পদ্ধতিতে চলে যাবে কমিশন। 

বিএসইসি চেয়ারম্যান ডিএসইর ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, আমি প্রথম মিটিংয়েই কমিশনকে বলেছি, আমি কাউকে টেনে নিয়ে বেড়াব না। স্টক এক্সচেঞ্জকে তার নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তাদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে কাজ করতে হবে। 

আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে তিনি জানান, এখন থেকে আইপিও আবেদন সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে জমা হবে এবং তারা পূর্ণ ক্ষমতায় তা যাচাই-বাছাই করে কমিশনে পাঠাবে।

মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে ব্রোকারদের ওপর আরোপিত কঠোর শর্তাবলি শিথিল করার এবং ডিজিটাল যুগে সিগনেচার জালিয়াতি রোধে অনলাইন ট্রেডিং অর্ডার ব্যবস্থা জোরদার করার কথা বলেন তিনি। বিএসইসি চেয়ারম্যান পুঁজিবাজারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিএসইসি ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করা এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের কর সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে এনবিআরের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স গণনার সহজ সলিউশন বের করার আশ্বাস দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে পুঁজিবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

তিনি উল্লেখ করেন, নতুন কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের ‘স্টক এক্সচেঞ্জকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর’ বার্তাটি বাজারের জন্য যেমন আশাবাদের, তেমনি নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বাজারের দীর্ঘদিনের ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ এবং ‘রেগুলেটরি নমনীয়তা’র সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম পুঁজিবাজারের অবকাঠামোগত সংস্কারের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেন। তিনি বলেন, ২০১২ সালের ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমটি গত ১২ বছরেও রিভিউ করা হয়নি, যা অবিলম্বে করা প্রয়োজন। এছাড়া সিডিবিএল ও সিসিবিএল-এ ডিএসইর অংশীদারিত্ব বর্তমানের চেয়ে বাড়িয়ে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।

বিএসইসির কাজের চাপ কমাতে এবং তদারকি জোরদার করতে তিনি জাপানের পুঁজিবাজারের জেএসডিএ বা আমেরিকার পুঁজিবাজারের ফিরার আদলে একটি ‘সেলফ-রেগুলেটরি অর্গানাইজেশন' বা স্ব-নিয়ন্ত্রিত সংস্থা তৈরির প্রস্তাব দেন। এছাড়া দ্রুত অন্তত ১০টি সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার এবং সিডিবিএল-কে সরাসরি ডাইরেক্ট লিস্টিং করার ওপরও জোর দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার, ডিএসইর পরিচালক ও কর্মকর্তা, ডিবিএ-র নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন অংশীজন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান তার বক্তব্যের শেষে একটি টেকসই এবং শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ার লক্ষ্যে সব অংশীজনকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন

×