ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো

পরমাণুর চেয়েও কার্যকরী অস্ত্র হরমুজ, এই প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো
×

ছবি: বিবিসি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৪:০৫

যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়েই ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। অন্তত সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে সে আভাসই মিলেছে। প্রথম দফায় ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পরে সৌদি আরব ও ইরান বসেছিল বৈঠকে। সর্বশেষ কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা সম্পন্ন হয়। প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ অবসানের পর কীভাবে আঞ্চলিকভাবে সহাবস্থান করা যায়, সে বিষয়টি।

ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ বলছে, এ ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা মাত্র শুরু হয়েছে। আগামীতে আরও বৈঠক হবে। কারণ ইরানের সঙ্গে নতুন স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। 

ইরানের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যান চলাচল কীভাবে সামলানো হবে, আর্থিক কী কী সুবিধা আসতে পারে, সুরক্ষা ছাড়ের বিনিময়ে ইরানকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কী দিতে পারে– এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনাগুলোর ধারেকাছে কোথাও যুক্তরাষ্ট্রকে দেখা যায়নি; বরং এটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ অবসানের চুক্তিতে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল টোল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা কমেছে এবং এটি কয়েক বছর ধরেই কমছে। তাদের (উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর) মূল ভাবনাটি হচ্ছে, আমরা ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাই। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পার হওয়া প্রশ্নে কোনো টোল চায় না। তারা নিজেদের এই অবস্থান একাধিকবার স্পষ্ট করেছে। একই অবস্থান নিতে দেখা গেছে পশ্চিমা অন্য দেশগুলোকেও। তবে ইরান এর পক্ষে। চ্যাথাম হাউসের আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, তাদের দিক থেকে এটি একটি সীমা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। 

অন্যদিকে উপসাগরীয় কূটনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন না যে ইরান তাদের ট্রাম্পকার্ড (হরমুজ প্রণালি) হারাতে রাজি হবে। ফলে তাদের সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে বাস্তবমুখী চিন্তা করা প্রয়োজন।

টেলিগ্রাফের হাতে আসা তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ‘পরিষেবা ফি’-এর মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, যা ওই জলপথের মাইন অপসারণের খরচ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তবে কোন সংস্থা এটির দায়িত্ব নেবে, তহবিল কীভাবে সংগৃহীত হবে, আর কার কাছেই-বা চূড়ান্ত অর্থ যাবে– সে বিষয়গুলো এখনও অস্পষ্ট।
এ প্রসঙ্গে টোল বলেন, ইরান অনুধাবন করেছে যে তাদের কাছে পরমাণুর চেয়েও কার্যকরী অস্ত্র আছে। আর তা হলো হরমুজ। এটি তারা যে কোনো সময়ে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে তারা এমন ব্যবস্থা চাইছে, যেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, এই প্রণালি হাতে রাখতে ইরান সবকিছুই করবে।

হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ‘সুনির্দিষ্ট ও ত্বরিত জবাব’ দেওয়া হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে কোনো বাধার মুখে পড়েনি নৌযান। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, রেকর্ড সংখ্যক নৌযান পার হয়েছে হরমুজ দিয়ে। 

সমঝোতা স্মারক হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরকে সমঝোতা লঙ্ঘনের জন্য দুষছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে লেবানন পরিস্থিতিও। তবে কারিগরি আলোচনা চলছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার জানিয়েছে, ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই পক্ষেরই ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি যোগাযোগ চ্যানেল শুরু করছে তারা।   

জাতিসংঘে ইরানের প্রতিবাদ
এদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে হত্যার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এই হুমকির তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে ইরানের পক্ষ থেকে। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, তাদের জনসাধারণ বা নেতৃস্থানীয়দের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।

এ ছাড়াও এ হুমকিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘে প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। তারা এটিকে অভিহিত করেছে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে। জাতিসংঘে ইরানের দূত আমি-সাঈদ ইরাভানি সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওই হুমকি ইচ্ছাকৃত ও পদ্ধতিগত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের অংশ, যার অধীনে ইরানি সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। ইরাভানি বলেছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইসরায়েলকে দায়মুক্তভাবে এসব করার অনুমোদন দিয়েছে এবং তেহরান এ ধরনের যে কোনো কিছুর জবাব দেবে।

লেবাননের জন্য ছাড় দেবে না ইরান
দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেছেন, লেবাননের জন্য ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ ছাড়বে না। 
আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে জানিয়েছে। বিষয়টি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, সেটির সরাসরি লঙ্ঘন। সেলুম বলছেন, তেহরান এরই মধ্যে ওই কর্মকাণ্ডের জবাবে সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ আলোচনা থেকে সরে এসেছে এবং হরমুজ নিয়ে হুমকি দিচ্ছে। তবে দুই পক্ষের কেউই সমঝোতা বাদ দেয়নি। কারণ ইরানের নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রেহাই দরকার। আর ট্রাম্পের প্রয়োজন হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা। 

তাঁর মতে, তেহরান আরও কঠোর হবে এবং হরমুজ নিয়ে নানাবিধ পদক্ষেপ নেবে কিন্তু লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা সরাতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং শাসন ব্যবস্থার পুনর্গঠনকে হুমকির মুখে ফেলবে না।

আরও পড়ুন

×