রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের ১০ হাজার একর জমি কাজে লাগানো হবে
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১১:০২
লোকসানে থাকা, রুগ্ণ হয়ে পড়া এবং সীমিত কার্যক্রমে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাকে এবার অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমবারের মতো পাঁচ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প করপোরেশনের আওতায় থাকা ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পভূমি ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প নিয়ে একটি খসড়া এসওই ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও বা রাষ্ট্রমালিকানাধীন শিল্পসম্পদের বিনিয়োগ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মালিকানা বদল নয়; বরং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যৌথ উদ্যোগ (জেভি), সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), দীর্ঘমেয়াদি লিজ ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের আওতায় বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে ‘ব্রাউনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট’। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি সংযোগ ও অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে না। অধিকাংশ প্রকল্পেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক ও বন্দর যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন।
তারা জানান, সরকারের মূল্য উদ্দেশ্য হলো– নতুন করে জমি অধিগ্রহণ না করেই বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা, আমদানি-বিকল্প শিল্প গড়ে তোলা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণ। এসব কারখানার রাষ্ট্রীয় মালিকানা হস্তান্তর করতে চায় না সরকার। তাই বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অলস সম্পদগুলোকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, খসড়া বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) ও বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় রয়েছে ইস্পাত, প্রকৌশল, রাসায়নিক, ওষুধের কাঁচামাল, টেক্সটাইল, চিনি, খাদ্য, পাট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের কারখানা। অধিকাংশ প্রকল্পই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প করিডােরে অবস্থিত, যেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক ও বন্দর যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনে সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সূত্র জানায়, যেসব খাত ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর সরকার সেসব খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানি কমিয়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানো। বিসিআইসির আওতায় ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল (এপিআই), লিথিয়াম ব্যাটারি, সোলার গ্লাস, সোলার প্যানেল এবং পাটখড়ি থেকে পাল্প ও কাগজ উৎপাদনের মতো প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
বিএসএফআইসির ১৫টি চিনিকলকে কেন্দ্র করে শুধু চিনি উৎপাদন নয়; ইথানল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে ২০ লাখ টনের বেশি চিনির চাহিদা থাকলেও রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো সরবরাহ করছে প্রায় ৩ শতাংশ। বিএসইসির আওতায় সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে অটোমোবাইল ও ভারী প্রকৌশল খাতে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে পূর্ণাঙ্গ অটোমোবাইল উৎপাদন কারখানা, আধুনিক বডি ও পেইন্ট শপ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের অ্যাসেমব্লি লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দেশের গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ হলেও উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য সীতাকুণ্ডে প্রায় ১০ একর অব্যবহৃত জমি রয়েছে। চট্টগ্রামে জিইএমকোর প্রায় ১২৩ একর শিল্পভূমিতে আধুনিক ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ট্রান্সফরমারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ চাহিদা এখনও আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। এ ছাড়া টঙ্গীতে এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডের অব্যবহৃত জমিতে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং বগুড়ায় বছরে তিন লাখ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরিবেশবান্ধব গ্রিন স্টিল মিল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দ্রুত এসব কারখানার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক উন্নয়ন কাজও হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই ইউটিলিটি সেবা ও অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। এর পরও সরকার বিনিয়োগকারীদের নীতি-সহায়তা, ঋণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়; বরং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। অন্যদিকে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পকারখানা পুনরায় সচল হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপ কমানোর সুফল পাবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ মূল্যায়ন, দ্রুত অনুমোদন এবং সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- শিল্পকারখানা
