ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

শুল্ক অস্থিরতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ৪ শতাংশ

শুল্ক অস্থিরতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রে  রপ্তানি বেড়েছে ৪ শতাংশ
×

আবু হেনা মুহিব 

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের জেরে গত বছরের এপ্রিল থেকে টালমাটাল হয়ে ওঠে রপ্তানি বাণিজ্য। চার দফায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক হারে পরিবর্তন আনা হয়। এতে প্রধান বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। এসব কিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ বিলিয়ন বা ৯০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।  

দেশের সার্বিক রপ্তানি আগের অর্থবছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেড়েছে ৪ শতাংশেরও বেশি। একক মাস হিসেবে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেশি হয়েছে ৪১ শতাংশ, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। 

রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এত বেশি শুল্ক দিয়ে ওই সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ভালো করতে পারছিল না। অবশ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত বিশ্বব্যাপী পাল্টা শুল্ক গত ২০ ফেব্রুয়ারি অবৈধ ঘোষণা করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্কের ব্যবধান কমে আসে। তবে কম শুল্কের সুবিধায় ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের দেওয়া রপ্তানি আদেশের কাজ অব্যাহত থাকে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর উপাত্ত বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০৫ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৬৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে ৩৬ কোটি ডলার। তৈরি পোশাক এবং পোশাক-বহির্ভূত প্রায় সব পণ্যের রপ্তানি সে দেশে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৬০ কোটি ডলার। ২০২২-২৩  অর্থবছরে  রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৫২ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান দেখানো হয়। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির যৌথ তদন্তে দেখা যায়, ওই অর্থবছরসহ কয়েকটি অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে ভুল ছিল। 

নারায়ণগঞ্জভিত্তিক প্যাসিফিক সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ সমকালকে বলেন, গত বছরের ৯ জুলাই ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের সময় রপ্তানি আদেশের ৬০ হাজার পিস টি-শার্টের উৎপাদন কাজ স্থগিত রাখার অনুরোধ করে একটি বড় মার্কিন ব্র্যান্ড। এরপর গত বছরের ১ আগস্ট পরিবর্তিত ঘোষণায় পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামানোর পর কাজ শুরু করতে বলে ব্র্যান্ডটি। এভাবে ক্রেতারা ফিরতে শুরু করেন। 

ঢাকাভিত্তিক মার্কিন বায়িং হাউস লিয়াং ফ্যাশনের মোট রপ্তানি আদেশের ৯৯ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের। প্রতিষ্ঠানটির একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, শুল্ক হ্রাসের ঘোষণার দিনই মার্কিন একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ৭৬ হাজার ৬০০ পিস লং প্যান্ট ও শর্টসের রপ্তানি আদেশের কাজ আবার শুরু করতে বলে। এভাবে একের পর এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আদেশ পেয়েছেন তারা। 

যু্ক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। ভিয়েতনামের কাছে আগেই প্রথম স্থান হারিয়েছে চীন।

গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘটনা দিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। তখন মোট শুল্ক ভার দাঁড়ায় ৫২ শতাংশে। ওই হার কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা স্থগিত করা হয়। তিন মাসের এ শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের ওপর নতুন করে পাল্টা শুল্ক ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। গত ১ আগস্ট থেকে এ হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় ১ আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়। 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করে সরকার। এতে শুল্ক কমে ১৯ শতাংশ হওয়ার কথা। তবে গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এর পরই বাংলাদেশসহ ১৫ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা–তা নিয়ে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেয় দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর। সে কার্যক্রম এখনও চলছে। 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য শনাক্তকরণ কোড হারমোনাইজ কোড (এইচএস কোড) ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শ্রেণি বিভাগ, শুল্ক নির্ধারণ এবং পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে থাকে। এইচএস কোড অনুযায়ী মোট ৯৮ ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক প্রধান। পোশাকের হিস্যা ৮৮ শতাংশ। পোশাক-বহির্ভূত পণ্যের মধ্যে হোম টেক্সটাইল, ক্যাপ, প্লাস্টিক, ফার্নিচার, ওষুধ ও সিরামিক উল্লেখযোগ্য। 

আরও পড়ুন

×