এবার সব হারাচ্ছেন তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডাররা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নন-ফাংশনাল বা অকার্যকর ঘোষণা করার পর এবার তালিকাভুক্ত তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার কেনাবেচা স্থগিত করেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত রোববার রাতে ঘোষণা করলেও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বা স্টক এক্সচেঞ্জকে কিছুই জানায়নি।
ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার আগে লেনদেন শুরু হয় এবং দরপতন হয় সাড়ে ৭ থেকে পৌনে ৯ শতাংশ। অবশ্য অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরের শেয়ারগুলোর বাজার মূল্য আগে থেকেই পতন হচ্ছিল। গতকাল সোমবার সর্বশেষ ২ টাকা ১০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৩০ পয়সায় কেনাবেচা হয়।
অকার্যকর ঘোষণা করার পর কোম্পানিগুলোর শেয়ার কী করে কেনাবেচা হলো–তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জানতে চাইলে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা জানান, চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জানার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি। গতকাল সকালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগাযোগ করা হয়। অকার্যকর ঘোষণার তথ্য নিশ্চিত হয়ে শেয়ার লেনদেন স্থগিত করতে সময় লেগেছে।
জানা গেছে, অকার্যকর ঘোষণা করা এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে অবসায়ন বা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। এ লক্ষ্যে পৃথকভাবে প্রশাসকও নিয়োগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রশাসকরা এখন এই চার প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন ও দায়দেনা মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত প্রদান তো দূরের কথা, স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর ক্ষমতা অনেক আগে হারিয়েছে। এ কারণে এগুলোর সমুদয় সম্পত্তি বিক্রি করে যে অর্থ মিলবে, তা থেকে দায়-দেনা পরিশোধ করে অবসায়ন বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর আগে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় ফার্স্ট সিকিউরিটি, স্যোসাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী এবং এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা, পরিচালক এবং নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সমুদয় শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। তবে ব্যাংক খাতে আস্থা ধরে রাখতে বিশেষ বিবেচনায় সব আমানতকারীর অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিয়েছে সরকার।
অকার্যকর ঘোষিত হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার লেনদেন আপাতত স্থগিত করা হলেও শেয়ারগুলো চূড়ান্তভাবে কী হবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি বিএসইসি। জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা কিছুই জানি না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। প্রায় একই চিত্র ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও ফারইস্ট ফাইন্যান্সে। তাদের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। এস আলম গ্রুপের মালিকানায় থাকা আভিভা ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে এ হার ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অবশ্য এ প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়।
অকার্যকর ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি মালিকানা রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্সে। এই প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশ। বিপরীতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার। বাকি ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। এই প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর বা অবসায়ন হওয়ার অর্থ হলো–এর প্রায় ৮০ শতাংশ মালিকানা থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি শূন্য হয়ে যাওয়া।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ক্ষেত্রেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে আরও ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ শেয়ার। অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪১ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার। ফারইস্ট ফাইন্যান্সে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৪৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ শেয়ার।
রুগ্ণ হয়ে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবসায়ন বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের মতো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিল শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। গত ফেব্রুয়ারিতে এ চিঠি দেয় সংস্থাটি। বিএসইসির ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থার জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনোভাবেই দায়ী নন। তাই কোম্পানিগুলো অবসায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম স্বার্থ রক্ষা করা
একান্ত প্রয়োজন।
- বিষয় :
- শেয়ারবাজার