ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বড় ঋণে ব্যাংকগুলােকে অডিট প্রতিবেদন জমা দিতে হবে

৫০ কােটি টাকা বা তার বেশি ঋণে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন লাগবে

বড় ঋণে ব্যাংকগুলােকে অডিট প্রতিবেদন জমা দিতে হবে
×

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বেনামি ও ভুয়া ঋণ ঠেকাতে কঠোর নীতিমালা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামীতে ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণ বিতরণের পর তা ব্যবহার বিষয়ে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাধ্যতামূলক অডিট করাতে হবে। এই অডিট প্রতিবেদন জমা দিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ভুয়া ঋণ, এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার, জামানতের উচ্চমূল্য দেখিয়ে ঋণের মতো জালিয়াতি ঠেকাতে এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং পরিভাষায় যা ‘এন্ড ইউজ মনিটরিং’ বা ঋণের শেষ ব্যবহার তদারকি হিসেবে বিবেচিত। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে তা পরিপালনের জন্য ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, তৃতীয় পক্ষের অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেবে। দেশে উচ্চখেলাপি ঋণের প্রধান কারণ বেনামি ও ভুয়া ঋণ। কেউ কেউ আবার বন্ধকি সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে টাকা বের করে নিয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশই পাচার করে ঋণগ্রহীতাও পালিয়ে গেছেন। ব্যাংকের পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শাখা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব জালিয়াতি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছর পরিদর্শন করলেও নানা কারণে তা আড়ালে রাখা হয়েছে। অডিট ফার্মগুলোও কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে। সঠিক ব্যবহারের অডিট প্রতিবেদন নিলে এ ঝুঁকি কমবে।

জানা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশে এই নিয়ম প্রচলিত আছে। পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতে বড় ঋণ বিতরণের পর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্ম দিয়ে ‘ইউটিলাইজেশন রিপোর্ট’ নিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় জমা দিতে হয়। কোনো ঋণের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার সন্দেহ হলেই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ফরেনসিক অডিট করানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বড় করপোরেট ঋণের প্রতি কিস্তি ছাড় করার আগে স্বাধীন অডিট ফার্মের ক্লিয়ারেন্স রিপোর্ট জমা দিতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী, বড় ঋণ ছাড়ের পর ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত বিরতিতে গ্রাহকের আর্থিক বিবরণী ও বহিঃনিরীক্ষকের রিপোর্ট নেওয়া হয়।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংক কর্মকর্তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে এ ধরনের ঋণ দিয়ে থাকেন। সেখানে সব কিছু আগেই প্রস্তুত থাকে। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য কেবল শাখা থেকে প্রস্তাব পাঠাতে হয়। এখন যদি ঋণের ব্যবহার পর্যায়ে কঠোর তদারকির বিধান করা যায় এবং সঠিকভাবে তা এগিয়ে নেওয়া যায় ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। ঋণ বিতরণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বচ্ছতা বাড়বে। ঋণ নেওয়ার পর নির্ধারিত খাতে খরচ করতে বাধ্য হবেন। এখনকার মতো ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বা বিদেশে পাচারের মতো অপব্যবহারের ঝুঁকি কমবে। আবার নতুন করে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে। তবে অনিয়ম ধরার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বড় ঋণ কারা পাচ্ছে এবং ঋণের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কিনা সে তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে গত মে মাসে প্রতিটি ব্যাংকের ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ, পুনঃতপশিল করা ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ কোন খাতে, কোন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে সে তথ্য নেওয়া হয়। এরপর কারা এই ঋণ পেয়েছে, আগের জালিয়াতি, অর্থ পাচারে যুক্তদের কেউ বেনামে বা অন্য উপায়ে ঋণ নিয়েছে কিনা, ঋণ পুনঃতপশিলে নিয়ম মানা হয়েছে কিনা তা দেখা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু অনিয়ম পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংক থেকে বেনামি ঋণ দেওয়ার একটি ঘটনা ধরা পড়ে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই বড় ঋণ পুনঃতপশিল, প্রয়োজনীয় জামানত না নিয়ে ঋণ দেওয়ার কিছু ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। এসব ব্যাংকের এমডিকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশ এখন উভয় সংকটে আছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে গত জুন শেষে রেকর্ড চার লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। আবার গত জুন শেষের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। আবার ২০২৫ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছে। এসব কারণে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অন্যরা মুনাফা করতে পারেনি। আবার ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের যেখানে সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করার কথা; সেখানে গত বছর শেষে ঋণাত্মক মূলধন ছিল ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। নতুন করে যেন আর খারাপ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয় সে জন্য বিভিন্ন কঠোরতা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×