ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এমসিসিআইর আলোচনা 

শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রক্ষায় সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতের আহ্বান

শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রক্ষায় সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতের আহ্বান
×

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

সমকাল প্রতিবেদক  

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৮ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৪

শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রক্ষায় পূর্বানুমানযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতারা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকার উদ্যোগে এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের (ডিএফএটি) সহায়তায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়। রোববার ঢাকার গুলশানে এমসিসিআই সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 

বৈঠকে বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪–২৫-এর তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ব্যবসায়িক অবকাঠামোর স্কোর ৭১ দশমিক ১ থাকলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে ৬৮ দশমিক ৮-এ নেমেছে। বিবিএক্সের জরিপ অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখোমুখি হন। অন্যদিকে মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে কাঠামোগত বা নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ দেখতে পেয়েছেন।

ফার্মাসিউটিক্যালস ও রাসায়নিক শিল্প এবং ইলেকট্রনিকস ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকট, অপর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ, জ্বালানি সংকট, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্নের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কারণে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চলতি আগস্টের শুরুতে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। 

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ। এরপর ‘বিজনেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার—পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি’ শীর্ষক উপস্থাপনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান। এতে বিবিএক্স -এর বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব এবং অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, লাফার্জ হোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, ইএসটেক্স  ফাউন্ডেশনের  চেয়ারম্যান ড. ইজাজ হোসেন এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম।

মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্যতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানান।

মইনুল ইসলাম বলেন, সিরামিক শিল্পের জন্য গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, এটি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি ও পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে যৌক্তিকতা, জ্বালানি বরাদ্দ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি মিশ্রণের ওপর গুরুত্ব দেন।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে দুর্বলতার প্রতিফলন। তিনি শিল্প খাতের জন্য একটি পৃথক জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং জ্বালানি-নির্ভর ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির  প্রশাসক ফজলুল হক। সমাপনী বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি. রহমান।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ সরাসরি শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। গ্যাসের নিম্নচাপ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিকল্প ও ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বিশেষ করে রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের আহ্বান জানান অংশগ্রহণকারীরা। একই সঙ্গে কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে সহায়তার জন্য আগাম ও বিশ্বাসযোগ্য লোডশেডিংয়ের সময়সূচি প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গোলটেবিল বৈঠক থেকে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ শিল্প সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় আস্থা তৈরির লক্ষ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক, তথ্য-প্রমাণনির্ভর ও বাস্তবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে ঐকমত্য হয়।

বৈঠক থেকে উঠে আসা সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নীতিপত্র প্রণয়ন করা হবে। এতে বিবিএক্স -এর তথ্যের সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো যুক্ত করা হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য কাঠামো নিশ্চিত করা, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ত্বরান্বিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো এতে গুরুত্ব পাবে।

আরও পড়ুন

×