ঢাকার দুই মেট্রোরেলে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সুদের বোঝা
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৮ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মেট্রোরেল লাইন-১ এবং লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চালু হওয়া একমাত্র মেট্রোরেল প্রকল্পের চেয়ে এর সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় দ্বিগুণের বেশি। প্রকল্প দুটির ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাইকার ক্রমবর্ধমান সুদহারে ঋণ পরিশোধ প্রকল্প দুটিকে আরও চাপে ফেলবে। এমআরটি-১ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং এমআরটি-৫ সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ঢাকার ভাটারা পর্যন্ত নির্মাণের কথা।
জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার সুদের হার ১ অক্টোবর থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর আগে ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে প্রকল্প দুটি একনেকে অনুমোদনের সময় জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ৬ এবং শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। নতুন এই বৃদ্ধির আগে এই হার ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। পরিবর্তিত এই সুদের হার বিবেচনায় নিলে দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত ৬৮৭ কোটি টাকা গুনতে হবে।
জাইকার ঋণের সুদের হার সাধারণত ছয় মাস পরপর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের পাঁচ বছরের নির্মাণকালে সুদের হার আরও বাড়তে পারে। ২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় দুই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদিত সংশোধিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। দুই প্রকল্পে জাইকার ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১২২ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে ঋণের সুদের হার না বাড়াতে জাইকার প্রতি লিখিত অনুরোধ জানানো হয়েছিল। গত ১ জুলাই জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর ঢাকা সফরের সময়ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে জাইকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে মেট্রোরেলের ব্যয়ের বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।
এশিয়া উইংয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘আমরা জাপানকে সুদের হার না বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলাম। জাপানের রিকন্ডিশন্ড বা ব্যবহৃত গাড়ির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে বাংলাদেশের দাবিটি আলাদা করে বিবেচনার কথাও বলা হয়। কিন্তু ঋণদাতা সংস্থাটি আমাদের অনুরোধ রাখেনি। নতুনভাবে আরোপিত সুদের হারেই ঋণ নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’
জানা গেছে, জাইকার ঋণের বাড়তি সুদের হার এড়ানোর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে একনেক বৈঠকে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটির সংশোধন অনুমোদন করা হয়। ওই দিনের একনেক বৈঠকে কার্যতালিকায় প্রকল্প দুটি ছিল না।
প্রকল্প দুটি যাচাই-বাছাই করে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। ওই বিভাগের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, একনেক বৈঠকের আগের দিন অফিস শেষ করা পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আলোচনা ছিল না। যথারীতি অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরার পর ওই রাতেই একনেক বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব তৈরি করে দিতে বলা হয়। একনেক বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি স্বীকার করেন, কম সুদের হারে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে সরকার তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি সংশোধন করেছে।
২০১৯ সালে মেট্রো লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ২০১৯ সালে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সুদে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও মেট্রো লাইন-১ প্রকল্পে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সুদে ১৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রাথমিক ঋণচুক্তি সই হয়। প্রকল্প দুটির অবশিষ্ট ঋণের জন্য সুদের হার বা শর্ত আগে থেকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। সে কারণে বাড়তি ঋণ বর্তমান বাজার হারের সুদেই নিতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, ঋণচুক্তির আগে ‘ম্যাচিং অ্যান্ড ম্যাচিউরিটি’ নিশ্চিত করা দরকার। চুক্তির আগেই চিন্তা করে দেখা উচিত, কিস্তি শুরুর আগে প্রকল্প থেকে আয় আসবে কিনা? যদি প্রকল্প থেকে আয় আসার আগেই মূল ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে যায়, তাহলে বিপদের কথা।
তিনি মনে করেন, সময়মতো মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ শেষ করা ও প্রত্যাশিত সেবা তৈরির মাধ্যমে বাণিজ্যিক মুনাফা নিশ্চিত করা না গেলে দুই মেট্রোরেলের বড় ঋণ এবং বর্ধিত সুদের হার দেশের জন্য বাড়তি ঋণের বোঝা হতে পারে। বাণিজ্যিক মুনাফা নিশ্চিত হলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
দুই প্রকল্পে জাইকার ঋণ কতটুকু বাড়ছে
একনেকে সাম্প্রতিক সংশোধনের পর এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে জাইকার ঋণের অংশ বেড়েছে ১১৩ শতাংশ। পরিমাণ বেড়েছে ৪৪ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। প্রথম অনুমোদনের সময় এ প্রকল্পে জাইকার ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ছে ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের দুটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত একটি রুট। নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল ও পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত আরেকটি রুট। বিমানবন্দর-কমলাপুর রুট হবে ভূগর্ভস্থ বা পাতাল। দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। স্টেশন থাকবে ১২টি। এগুলো হচ্ছে– বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল ৩, খিলক্ষেত, নর্দ্দা, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, আফতাবনগর, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।
এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পে জাইকার ঋণের অংশ বেড়েছে ১৩২ শতাংশ। অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। পরিমাণ বেড়ে এখন মোট দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে মূল অনুমোদনের সময় প্রকল্পে জাইকার ঋণের অংশ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। পুরো প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে ১১৮ শতাংশ, যার পরিমাণ ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত রুট নিয়ে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি ঢাকার পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের পরিবহন যোগাযোগ সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এই রুটটির মোট দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। মোট স্টেশন সংখ্যা ১৪টি। ৯টি পাতাল ও পাঁচটি উড়াল। পাতাল স্টেশনগুলো হচ্ছে– হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলমালিয়া, আমিনবাজার, গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর ১, মিরপুর ১০ ও সিরামিকস। আর উড়াল স্টেশনগুলো হচ্ছে– কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান ২, নতুনবাজার ও ভাটারা। এ ছাড়া অন্যান্য এমআরটি লাইনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে।
সার্বিকভাবে সুদের হার বেড়েছে
২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া ঋণের ওপর সুদ বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এ হার ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। এর পর অতিমারি করোনার অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পর ক্রমে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার মতো জাইকার ঋণেও সুদ বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত জাইকার ঋণে সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। সেই সুদও শেষ পর্যন্ত মওকুফ করে দেওয়া হতো। তবে জাপানের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে তারাও সুদের হার বাড়াচ্ছে।
ইআরডির আমেরিকা ও জাপান অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে হারে ঋণ নিয়ে থাকে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন সহযোগীরা সুদের হার নির্ধারণ করছে। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিয়ে থাকে তারা। জাইকাও একই পদ্ধতিতে সুদের হার নির্ধারণ করছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে কেন্দ্র করে নমনীয় ঋণ কমছে, বাড়ছে বাজারভিত্তিক হারের ঋণ। বাজারভিত্তিক ঋণের জন্য বাংলাদেশকে এখন গড়ে ৬ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
- বিষয় :
- মেট্রোরেল
- বিশ্বব্যাংক
- জাইকা
- সুদহার