প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা
মাহমুদ হাসান আরিফ
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:১৫
সময় গতিময়। আমরা একটি বয়সে এসে পৃথিবী জয় করার শক্তি নিয়ে কাজ করি, দুমড়েমুচড়ে ফেলি সব বাধা; কিন্তু বয়সের ক্রান্তিলগ্নে এসে হেরে যায় সেই বয়সের কাছেই। এই বয়স্কতা আর মৃত্যুর মাঝে যে সময়টুকু থাকে, তা সুন্দর আর শান্তিময় রাখতে যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার, তা হলো সুস্বাস্থ্য। বিশেষ করে দরকার প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা। আমরা কতটুকু এ ব্যাপারে ভাবি! কতটুকুই-বা শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে এ জন্য প্রস্তুত? বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্সের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে প্রবীণ-বৃদ্ধের জনসংখ্যার হার ছিল ৫.৭ শতাংশ, যা বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫ শতাংশ (এক কোটি ২৫ লাখ)। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। গড় আয়ু বৃদ্ধির অন্যতম কারণ শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমেছে, উন্নতি হয়েছে জীবনমানের আর স্বাস্থ্যসেবার। এভাবে প্রবীণের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আমরা খুব খুশি, সন্দেহ নেই; কিন্তু আমরা তাদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রস্তুত কি? সহজ কথায়, সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আমরা এখন শিশু স্বাস্থ্যসেবা বা প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবাকে আলাদা করে দেখি।
তেমনি সময় এসেছে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি আলাদা দৃষ্টিতে দেখার। কারণটা সহজ; তবে ভাবতে হবে ভিন্নভাবে। প্রবীণদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোতে চলার ভারে যে দুর্বলতা আসে, তা অফেরতযোগ্য। তা সাধারণ সজীব মানুষের মতো নয়। প্রবীণদের রোগবালাই বহুমুখী অর্থাৎ তিনি একসঙ্গে বহু রোগে জর্জরিত এবং তার চিকিৎসাও হতে হবে বহু চিন্তাশীলতায়। তার বিভিন্ন রোগের ওষুধও বিভিন্ন এবং এসব ওষুধের সমন্বয় ও তা নিয়মিত পর্যালোচনা করাটা দরকার। বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য সাধারণের চেয়ে ভিন্ন, তা গবেষণায় প্রতীয়মান। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও বিশেষ যত্নবান হওয়া দরকার। সদ্যোজাত শিশুর সাফল্য হচ্ছে, সে তার নিজ ইচ্ছাই চোখ খোলা-বন্ধ করে আপন মানুষদের দেখে। একজন ৬০ বছরের প্রবীণের সাফল্য, তিনি যেন নিজে আয় করে সংসারে আর্থিক সাহায্য করতে পারেন। ৬৮-৭০ বছরের প্রবীণের সাফল্য, তিনি যেন নিজের কাজের বিষয়ে নিজের মতামত দিতে পারেন এবং মৃত্যুপথযাত্রী প্রবীণের সাফল্য হচ্ছে, তিনি তার নিজ ইচ্ছায়ই চোখ খোলা-বন্ধ করে আপন মানুষদের দেখে শারীরিক ও মানসিক শান্তিতে মরতে পারেন। এশিয়ায় সর্বপ্রথম প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা চালু হয় হংকংয়ে ১৯৭৫ সালে। পরে ১৯৯৮ সালে এশিয়ার দশটি দেশের সম্মিলিত প্রয়াসে যাত্রা শুরু হয় এশিয়ান ওয়ার্কিং গ্রুপের। ভারত সরকার ২০১১ সালে প্রবীণ স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এ বিষয়ে কতদূর এগিয়েছে?
প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতেই হবে। এই ভাবনাটা উন্নত বিশ্বে আছে বলেই তারা এত উন্নত। সেসব দেশের জনগণ জানে, যৌবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে যদি দেশের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করে, বয়সকালে তাদের খোঁজ রাখার অর্থ ও কাঠামো অর্জন করতে পারবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এখনও সেভাবে ভাবতে পারছি না। দেশে ছোট-বড় কিছু সংস্থা বা এনজিও এ নিয়ে কাজও করছে সত্য। তবে তা প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবার আদলে নয় বলে এর তেমন সুফল মিলছে না। মোদ্দা কথা, আমাদের দেশে এখনও প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবার কোনো কাঠামোই তৈরি হইনি। অথচ তা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের কর্মঠ জনগোষ্ঠীকে বুঝতে হবে, আর মাত্র ১০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রবীণদের কাতারে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে এখনই যদি পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে। প্রবীণদের ব্যাপারে সরকার ও সচেতন সবাইকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে।
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
