গণতন্ত্র ও কথোপকথনের রাজনীতি
এমাজউদ্দীন আহমদ
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:১৭
আমাদের গণতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তর কথা আছে। এর বিশ্নেষণে দৃষ্টি দিতে হবে পেছনের দিকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে খানিকটা আলো দেখা গিয়েছিল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক হওয়ার পথটি উন্মুক্ত হলেও নানা মহলে অনেক প্রশ্ন ছিল আগে থেকেই ওই নির্বাচন ঘিরে। তখন অনেকেই বলেছিলেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়াটাই শেষ কথা নয়, বড় কথা হলো- নির্বাচনটি যাতে প্রশ্নমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য হয় তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বরের (২০১৮) নির্বাচন সেই প্রত্যাশা পূরণ তো করতে পারেইনি, উপরন্তু গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও স্বচ্ছ রাজনীতির বিষয়ে আরও অনেক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র আছে কিনা- প্রশ্নটি ইতোমধ্যে বহুবারই উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর প্রশ্নটি আবারও উঠেছে এবং বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন শক্ত ভিত্তির ওপরই দাঁড়ায়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কতটা মঙ্গল অথবা অমঙ্গলজনক হয়েছে কিংবা ওই নির্বাচন গণতন্ত্রকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে- এ নিয়ে গভীর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের প্রয়োজন নেই। যে ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ওই নির্বাচন, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর বার্তাই দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে এখানে কার্যকর নয়, এও স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে পরাজিতদের অভিযোগ থাকলেও সাধারণভাবে সেসব নির্বাচন কিন্তু সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠতে থাকে তাতে এটুকুই বলা যায়- উল্টো পথে চলতে শুরু করে গণতন্ত্র।
দলীয় সরকারের অধীনে যে আমাদের দেশে প্রশ্নমুক্ত কিংবা স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আবারও প্রমাণ হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বিগত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতির হার এতই কম ছিল যে, তাতে প্রতীয়মান হয়- নির্বাচন প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থার ওপর ভোটারের আস্থা বিনষ্ট হয়ে গেছে। ক্রমে ক্রমে নির্বাচন ব্যবস্থাটাকেই দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো কঠিন প্রশ্নের মুখে। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের যে শর্ত সেগুলোর দশা বিপন্ন হচ্ছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমেও প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র আছে কিনা, এ নিয়ে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, সেখানে গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। উপরন্তু বাংলাদেশকে তারা যেভাবে আখ্যায়িত করেছিল, তা অনুতাপের। একটা গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অনেক কিছুই নির্ভর করে দেশে নির্বাচনের মান কতটা ভালো কিংবা স্বচ্ছ হলো এর ওপর।
গণতন্ত্র অবশ্যই এক ধরনের ব্যবস্থা। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক সমাজব্যবস্থা। এক ধরনের সিস্টেম। সবার আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র সবার জীবনকে স্পর্শ করে। সবার জন্য রচনা করে এক বলিষ্ঠ জীবনবোধ। সমস্বার্থের মোহনায় সবাইকে করে মিলিত। সমস্বার্থের সুষম বন্ধনে সবাইকে করে সংগ্রথিত। সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের উপত্যকায় সবাইকে করে সংগঠিত। এ ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘুও। অন্যদিক থেকে গণতন্ত্র এক প্রক্রিয়াও বটে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি স্বীকৃত হয় স্বতন্ত্র, অনন্যরূপে। কারও ওপর নির্ভরশীল সে নয়। নয় কারও মুখাপেক্ষীও। আপন মহিমায় সবাই ভাস্বর। তার সম্মতি ছাড়া তাকে শাসন করার কারও অধিকার নেই। তার সম্মতি ছাড়া তার ওপর কর ধার্য করার ক্ষমতা নেই কারও। তা ছাড়া যে কোনো নীতিনির্ধারণে এই প্রক্রিয়ায় সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তির ইচ্ছা হয় প্রতিফলিত। সবার সম্মতি নিয়েই সমাজব্যবস্থা হয় পরিচালিত। সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু তাই একত্রে কাজ করে। আর এদিক থেকে বলা যায়, গণতন্ত্র এক ধরনের নৈতিকতা। পরিশীলিত এক কর্মপ্রবাহ। রুচিকর এক যৌথ উদ্যোগ। গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম বিষয় হলো কথোপকথন। এই কথোপকথনের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। কিন্তু আমাদের এখানে এরই বড় অভাব। 
এ কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার, গোপনীয়তার জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাপিয়ে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের সূচনা হয় সর্বসাধারণের সমক্ষে, মুক্ত আলোয়। ষড়যন্ত্রের অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড। বেরিয়ে আসে প্রকাশ্য দিবালোকে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হয় বলে সমমানসিকতা প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে। অন্যের দিকে তাকিয়ে সবাই নির্ধারণ করে নিজেদের পদক্ষেপ। নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের আচার-আচরণ। আমার জন্য যা পীড়াদায়ক, অন্যের কাছে তা সুখকর হতে পারে না। আমি যা খুশি করব, তা তো হতে পারে না। এই সত্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রের কৌশল রুচিসম্মত। তার চর্চা হয় অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে। নীরবে নয়, তারস্বরে। নির্জনে নয়, জনারণ্যে। সুতরাং একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র হলো উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি। সুরুচির প্রতীক। স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতিচ্ছবি। সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের নিশ্চিত নীড়। প্রক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র হলো সহযোগিতার সূত্র। আস্থা ও বিশ্বাসের অন্তরঙ্গ সুর। সমঝোতার ক্ষেত্র। মুক্তবুদ্ধির বিস্তীর্ণ অঙ্গন। এদিক থেকে গণতন্ত্র যেমন উপায়, তেমনি উপেয়। সমাজ জীবনের যেমন লক্ষ্য, তেমনি মাধ্যমও। গন্তব্য ও পথ দুই-ই।
সফল গণতন্ত্রের কয়টি অঙ্গীকার রয়েছে। এক. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তা জনগণের ক্ষমতা। সরকার আমানত হিসেবে সেই ক্ষমতা ধারণ করে প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সমাজের অনুমোদিত পন্থায়, ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে অথবা সমাজ কর্তৃক অনুমোদিত পন্থা অনুসরণে ব্যর্থ হলে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই সত্য স্বীকৃত হতে হবে। দুই. গণতন্ত্রে ব্যক্তি প্রাধান্যের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের প্রাধান্য। প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের রাজত্ব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন সর্বজনীন। আইনের প্রতি আনুগত্য, কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়, তা তিনি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন অথবা যত উঁচু পদেই অধিষ্ঠিত থাকুন না কেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরেকটি অঙ্গীকার হলো আইন মেনে চলতে হবে। আইন প্রণয়ন করেন জনপ্রতিনিধিরা। আইন পরিবর্তনও করেন তারা। গণতন্ত্রে সবাই আইন মেনে চলে। মন্দ আইন হলে তা পরিবর্তিত হয়; কিন্তু যত দিন তা পরিবর্তিত না হচ্ছে, ততদিন তা মানতেই হবে। তিন. গণতন্ত্রের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে জোরের যুক্তির পরিবর্তে যুক্তির জোর কার্যকর হয়। সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় সমঝোতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য যেমন প্রয়োজন গণতান্ত্রিক কাঠামো, তেমনি প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মন। প্রয়োজন কাঠামোর সর্বস্তরে স্পন্দিত অন্তঃকরণ। কাঠামোকে সিক্ত করার জন্য গণতান্ত্রিক চেতনার ঘন আস্তরণ। গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে দুই-ই অপরিহার্য। কাঠামো সৃষ্টি করে নৈতিক এক পরিমণ্ডল। রচনা করে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাথমিক পর্যায়। কিন্তু গণতান্ত্রিক কাঠামোয় গণতান্ত্রিক মনের প্রসার ঘটানো, কাঠামোকে প্রাণোচ্ছল করাই চূড়ান্ত পর্ব। আর এ জন্য চাই ভিন্নমতের মূল্যায়ন ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ ঘটিয়ে কথোপকথনের রাজনীতির বিকাশ ঘটানো।
উল্লিখিত বিষয়গুলো গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। আমরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে যত কথাই শুনছি না কেন কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব শর্তের উপস্থিতি কতটা বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়? আমাদের ক্ষমতাসীন মহল এখনও মনে করে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার অবকাশ নেই। তাদের কোনো কোনো নীতিনির্ধারকের বক্তব্য হলো, কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও করছে। আমি মনে করি, ওই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটা টেস্ট কেস ছিল। কারণ বিগত ২৭ বছরের মধ্যে ওইবারই দলীয় ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দলীয় কিংবা ক্ষমতাসীনদের অধীনে ভালো নির্বাচন হতে পারে নানা রকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও- এই ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি শাসক মহল।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থা রুগ্ণ। এ জন্য দায়ী অসুস্থ রাজনীতি। গণতন্ত্রকে গতিশীল করতে হলে রাজনীতিকে কল্যাণমুখী করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। প্রয়োজন রাজনীতিকে ক্ষমতার রাজনীতির পূতিগন্ধময় গহ্বর থেকে উদ্ধার করা। রাজনীতি একবার তার সনাতন বিশুদ্ধ রূপ ফিরে পেলে আজকে সমাজ জীবন যে অবস্থার কবলে পড়ে অহর্নিশ ছটফট করছে, তা থেকে অব্যাহতি পাবে। সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্তি লাভ করবে। বৈরী পরিবেশের অবসান ঘটবে। শুচিতা ফিরে আসবে। যুক্তিবুদ্ধির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। ভিন্নমত প্রকাশে পথ হবে মসৃণ। এ অবস্থা আপনাআপনি আসবে না। এ জন্য প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ। সমাজের বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী-জ্ঞানী-গুণী ও সচেতন অংশের সচেতন উদ্যোগ। এ উদ্যোগ দুই খাতে প্রবাহিত হতে হবে- এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনে উদ্যোগী হতে হবে; দুই. যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্নিষ্ট রয়েছেন, তাদের ওরিয়েন্টেশন বা মনমানসিকতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাঠামো রচিত হয়েছে বটে; কিন্তু সেই কাঠামোয় বিরোধী দলগুলোর সম্পৃক্ততার সুযোগ এখনও সেরকমভাবে সৃষ্টি হয়নি। বর্তমান জাতীয় সংসদে যাদের বিরোধী দল হিসেবে বলা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রকৃত সংজ্ঞাকে তা কতটা যুক্তিযুক্ত তাও তো প্রশ্নের বিষয়। গণতন্ত্রের জন্য এসব মোটেও ভালো খবর নয়। আমরা যদি নির্বাচন ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়াকে প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য করতে পারি, তাহলে হয়তো বিশ্ব গণতান্ত্রিক সমাজে নন্দিত হতে পারব। তখন হয়তো আমাদের দেশের নামটাও তাদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি জিইয়ে রেখে তা অর্জন করা দুরূহ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
