ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পুরুষের সুমতি, নারীর সমুন্নতি

পুরুষের সুমতি, নারীর সমুন্নতি
×

আফতাব চৌধুরী

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২০ | ১৫:২৬

নারী বন্দনায় বরাবরই বেজে ওঠে পুরুষের কণ্ঠস্বর। নারী বীরাঙ্গনা, শ্রেয়সী, ঊয়সী, নন্দিতা, নন্দিনী, ভাস্বতী ইত্যাদি শব্দে পুরুষ কর্তৃক বিশেষায়িত। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, পুরুষের এ নারী বন্দনা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্ন দাঁড় করায়। প্রাণঘাতী আচরণে প্রাণেশ্বরীর প্রাণনাশ ও অর্ধাঙ্গিনীর অঙ্গহানি ঘটছে; এমন দৃষ্টান্তও কম নেই। ভাস্বতী-নন্দিনীদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অ্যাসিড ছুড়ে হেমাঙ্গী, পদ্মলোচনাদের অন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো পুরুষের যৌন আগ্রাসনের শিকার হয়ে কত নারীর জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা! এমনকি অস্পৃশ্যতার শিকার হয়ে 'নরক যন্ত্রণা'র একঘরে জীবনযাপন করছেন কোনো কোনো নারী। কখনও শোনা যাচ্ছে মুমূর্ষু রোগীর মতো কোনো কোনো নারীর সকরুণ আর্তনাদ। একসময় সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবাদের সহমরণে যেতে বাধ্য করা হতো। ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহনের সময় উইলিয়াম বেন্টিংক আইন করে তা বন্ধ করে দেন। বিধবারা পুনরায় বিয়ের কথা চিন্তা করতে পারত না। অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একা রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তদানীন্তন সরকারকে ১৮৫৬ সালের ১৫ নভেম্বর আইন বিধিবদ্ধ করেন। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে 'দেবদাসী'দের বিয়ের কোনো অধিকার ছিল না। অবশেষে ১৯৮২ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের বিয়ে করার অধিকার স্বীকৃতি লাভ করে। নারীদের সুরক্ষা-নিরাপত্তা দিতে আমাদের দেশে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা রচিত হয়েছে। ধর্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। অফিস বা কর্মস্থলে নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার। তার জন্য রয়েছে অন্য ধারা। স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর যৌন সম্পর্কের প্রতিকার রয়েছে ভিন্ন এক ধারায়। এত আইন থাকা সত্ত্বেও নারীরা কি সুরক্ষিত; নিরাপত্তার বলয়ে আশ্রিত? উত্তর অবশ্যই নেতিবাচক।

আমাদের বাঙালি সমাজেও যৌতুক প্রথা এক ভয়ংকর ব্যাধি, যা সংক্রমিত হয়ে গোটা সমাজকে জর্জরিত করে তুলেছে। হিন্দু ধর্মে পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীদের কোনো অধিকার নেই। তাই বিয়ের সময় আর্থিকভাবে একটু বিবেচনা করা হয়। এ আর্থিক বিবেচনাকে উপলক্ষ করে স্বামীদের প্রলোভিত আগ্রাসী মন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে। নারী নির্যাতন-হননের ক্ষেত্রে এ কন্যাপণ অর্থাৎ বিয়ে-শুল্ক্ক বহুলাংশে দায়ী। কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। নারী-পুরুষ সবাইকে সচেতন হতে হবে। গণশিক্ষা ও চেতনার আলোকে গোটা সমাজকে উদ্বুদ্ধ-উজ্জীবিত করতে হবে। এখনও বহু কুসংস্কার নারী নির্যাতনের মূলে রয়েছে। প্রেতাত্মা অথবা ডাইনি সন্দেহে এখনও বহু নারীকে খুন করা হয়। সম্প্রতি চীনে একটি সন্তান দাম্পত্য জীবনের আদর্শ বলে গণ্য। কারণ একমাত্র সন্তান যাদের আছে, সরকারি আর্থিক সহযোগিতায় তার ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। চীন সরকার জনসংখ্যা বিস্টেম্ফারণ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। এক সন্তান হিসেবে সবার পুত্রসন্তান কাম্য হওয়ায় কন্যাভ্রূণ হত্যা বেড়ে গেছে সেখানে। ফলে এক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে চীনে আরেক আত্মঘাতী অর্থাৎ মানব-প্রজন্মঘাতী সমস্যার জন্ম হচ্ছে।

অসহায়-হতদরিদ্র নারীরা চরমভাবে নির্যাতিত হলে তাদের ন্যায়িক প্রতিকারপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রেই দুরাশা। তারা ব্যয়বহুল ন্যায়িক প্রতিকার পেতে অক্ষম। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় একেকটি 'ওপেন লিগ্যাল সেল' রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, যেখানে নির্যাতিতরা নিখরচায় ন্যায়িক প্রতিকার পাবেন। কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের মাত্রা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। মানবসম্পদ উন্নয়নের অর্ধেক অংশীদার নারী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন, 'বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।' গৃহের অঙ্গন থেকে নারীর আজ সর্বত্র যাত্রা। এ যাত্রার নির্ঝর ধারা ও শক্তির নিত্যনতুন মাত্রাও অব্যাহত। তাদের সৃজনশীলতা অক্ষত-অব্যয় রাখার জন্য সুরক্ষা-নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমুন্নতি না ঘটলে কখনও উন্নত সমাজ রচনা সম্ভব নয়।
 

পরিবেশকর্মী; বৃক্ষরোপণে জাতীয় পদকপ্রাপ্ত

আরও পড়ুন

×