একজন আবুল মনসুর আহমদ
ড. মোহাম্মদ আজম
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪১
আবুল মনসুর আহমদ পড়া খুব সহজ কাজ নয়। যে অর্থে পাঠে কোনো টেক্সটের নিয়ন্ত্রক ও নিয়ামক ভাবধারাগুলো বিশেষভাবে নজরে রাখা হয়। অর্থাৎ যে ডিসকোর্সগুলো কোনো রচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, সেগুলোর দিকে তীক্ষষ্ট নজর রেখে টেক্সট পঠিত হয়, সে অর্থে যে কোনো পড়াই দুরূহ। সেদিক থেকে আবুল মনসুর আহমদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার তাৎপর্য এই যে, বাংলাদেশের প্রভাবশালী ভাবধারার সঙ্গে তাঁর বইগুলোতে উপস্থাপিত ভাবধারার খুব একটা মিলমিশ নেই। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন সাধারণভাবে পড়ার সময়কালীন প্রভাবশালী ভাবধারা অনুযায়ী পড়ি; লেখার সময়েও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওই একই ঘটনা ঘটে।
এ কথা ভাবা বা বলার কোনো কারণ নেই যে, আবুল মনসুর আহমদ আমাদের প্রভাবশালী ভাবজগতে কোনো অর্থে প্রান্তীয় হয়ে আছেন। ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রধান যেসব লগ্ন বা মুহূর্ত অবলম্বন করে মূলধারার ন্যারেটিভ রচিত হয়ে থাকে, তার বেশ কয়েকটিতে আবুল মনসুর আহমদ নিজের কেন্দ্রীয় উপস্থিতি এবং ভূমিকা নিশ্চিত করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন এ ধরনের দুটি মাইলফলক মুহূর্ত। তিনি রাজনীতি করতেন, সাহিত্য করতেন, সাংবাদিকতা করতেন। অভিজাত বলয়ে এ তিনটিরই কৌলীন্য স্বীকৃত। তদুপরি তিন ক্ষেত্রেই তাঁর উঁচুদরের ভূমিকা এতটাই স্পষ্ট যে, তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বেশ কিছু রম্য ও ব্যঙ্গ রচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল বা আছে। তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী রচনা 'আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর' সম্ভবত সমধর্মী রচনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পঠিত ও সমাদৃত। সুতরাং বলা মোটেই সঙ্গত হবে না যে, আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের মূলধারার চর্চার মধ্যে কোনোভাবে প্রান্তিক হয়ে আছেন।
তাহলে প্রথমে আমরা যে দাবি করলাম, আবুল মনসুর আহমদ পড়া সহজ কাজ নয়, তার তাৎপর্য কী? বোঝার জন্য তাঁর রচনাবলি পড়ার দুটি দিকের উল্লেখ করা যাক। রম্য ও ব্যঙ্গ রচনা তিনি লিখেছেন সাহিত্যিক জীবনের প্রথমাংশে। প্রথমদিকের রচনাগুলো মুখ্যত মুসলমান ধর্মজীবীদের নিয়ে লেখা এবং ক্রমশ তিনি গেছেন রাজনৈতিক ব্যঙ্গের দিকে। এ রচনাগুলো আমরা আরামের সঙ্গে পড়ি। কারণ, আমাদের প্রভাবশালী ভাবধারার সঙ্গে এগুলোর খুব একটা বিরোধ নেই। অন্যদিকে তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলোর যে অংশ আমাদের প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী বয়ানের সঙ্গে খাপ খায় বা প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী বয়ানের জন্য জরুরি, সে অংশটা পড়তে বা উল্লেখ করতে আমাদের অস্বস্তি হয় না। আমরা ভীষণ রকম অস্বস্তিতে পড়ে যাই তাঁর রচনার ওই অংশ নিয়ে, যেখানে তিনি গেছেন অন্যদিকে; প্রভাবশালী ভাবধারার পর্যালোচনাপূর্বক সেগুলোকে নাকচ করেছেন এবং উপস্থাপন করেছেন সম্পূর্ণ অন্য ধরনের চিন্তাধারা।
আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতিচিন্তা নিয়ে যে লেখাগুলো এখানে পত্রস্থ হলো, তার কোনো কোনোটি সুলিখিত, কোনো কোনোটি অতটা নয়। কিন্তু একটা দিক থেকে সবার পারস্পরিক সাযুজ্য আছে। তাঁরা সবাই গেছেন সহজ আরামের দিকে- প্রভাবশালী বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত পাঠ করেছেন। এই পাঠও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এর মধ্য দিয়ে অনেকেই আবুল মনসুর আহমদ প্রথমবারের মতো পড়েছেন- অন্তত সক্রিয় পাঠের বিচারে। ফলে এ ধরনের রচনা প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখা দরকার। তবে পড়া যেন আরও নিবিড়ভাবে হয়, যিনি পড়ছেন বা লিখছেন, তাঁর চিন্তা যেন আলাদা চিহ্নসহ হাজির হতে পারে, সে জন্য কোনো বিশেষ বই ধরে রচনা আহ্বান করা যেতে পারে। এমন বিষয় ঠিক করা যেতে পারে, যে বিষয়গুলো নিয়ে ইতিপূর্বে খুব একটা লেখালেখি হয়নি। এ পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারীদের মৌলিকত্ব নিশ্চিত করা যাবে।
আশা করা যায়, সমাজের বিচিত্র অংশের সৃষ্টিশীল অংশগ্রহণে আবুল মনসুর আহমদের 'জটিল' অংশগুলো ধীরে ধীরে সরল হয়ে আসবে এবং ব্যবহার-উপযোগিতা ক্রমশ বাড়বে।
হসহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- আবুল মনসুর আহমদ
