জনস্বাস্থ্য ও গণবিভ্রান্তি
ফাইল ছবি
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০ | ১২:১০
করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে 'জনস্বাস্থ্য' ধারণার গণবিভ্রান্তির বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞানুসারে, 'জনস্বাস্থ্য' এমন একটি বিজ্ঞান, যা সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ, জীবনকে দীর্ঘস্থায়ী করা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। জনস্বাস্থ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং স্বাস্থ্যের সামগ্রিক দিক নিয়েই কথা বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সংজ্ঞায় 'সবার সম্মিলিত উদ্যোগ' বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ দেশে অনেকেই মনে করেন, স্বাস্থ্য বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সরকারের শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এ রকম ধারণা শুধু জনমানুষ নয়, যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের অনেকেও মনে করেন। ফলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে সব প্রশংসা-পুরস্কার যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, তেমনি কোনো প্রাদুর্ভাব হলে দোষ কিংবা বদনাম তাদের একারই। করোনাভাইরাসের এই সময়ে এ বদনামের দায়টাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একারই নিতে হচ্ছে!
কিন্তু এমনটি কি হওয়ার কথা ছিল? না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সংজ্ঞা তো বটেই, ১৯৭৮ সালের 'আলমা-আতা' ঘোষণা; পরে ১৯৮৬ সালের অটোয়া চার্টারে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে স্বাস্থ্যমুখী জননীতিমালার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটি ধারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা একটি সরকারের সব নীতিমালায় স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা ও সব ক্ষেত্র ও সংস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ থাকবে। বাংলাদেশের জননীতিমালা ও তার প্রয়োগে বৈশ্বিক এই ধারণাগুলো কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে? আমরা যদি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নীতিমালাসহ নানা গাইডলাইন, কর্মকৌশল, নির্দেশিকা, পরিপত্র ইত্যাদির দিকে তাকাই, তাহলে দেখি, এগুলোতে স্বাস্থ্য বিষয়টি নানা মাত্রায় গুরুত্ব পেয়েছে। যেমন, শিক্ষানীতিতে (২০১০) আছে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, তাদের শারীরিক চর্চার বিষয়; নিরাপদ খাদ্য আইনে (২০১৩) আছে জনস্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণের বিষয়। আর খোদ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে (২০১১) জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগের কথা গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। অধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষদ নামে একটি ফোরাম আছে, যার নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।
এত দালিলিক নির্দেশনা, নীতিমালা ও গাইডলাইন থাকা সত্ত্বেও করোনাভাইরাসের মতো এত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কেন শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত হলো- তা এক বিরাট প্রশ্ন বটে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবশ্যই নেতৃত্ব দেবে। তার মানে এই নয় যে, তারা এ কাজটি একা করবে। এর অর্থ এই যে, তার সব কাজ হতে হবে সমন্বয়ের মাধ্যমে; সবাইকে নিয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি মনে করে, করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা শুধু তার একার কাজ, তাহলে এটি এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে জনস্বাস্থ্য বিষয়টি আমাদের দেশে একটি ভুল ধারণার মধ্য দিয়ে চলেছে। এ জন্য সবচেয়ে দায়ী চিকিৎসক নিজেই, যাদের কাছে স্বাস্থ্য মানে মানুষের শরীর, রোগ ও ওষুধ। স্বাস্থ্য মানে হাসপাতাল, মেশিন ও টেস্ট। এ জন্য জেলায় সিভিল সার্জনের দায়িত্বে থাকেন একজন চিকিৎসক অথচ তার কাজ কিন্তু জনস্বাস্থ্য নিয়ে। স্বাস্থ্য যে একটি সামগ্রিক বিষয়, তা বাস্তব ক্ষেত্রে মোটামুটি উপেক্ষিত। এর ফলে যখন কোনো সংকট আসে, তখন সবাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে আঙুল তুলে তাকায়। অথচ নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকাই নেই। কিন্তু ডেঙ্গু হলে এই শহরে সবাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা দেখতে চায়। স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে এই বিভ্রান্তি দূর করা গেলে হয়তো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আমরা আরও আগেই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে পারতাম।
জনস্বাস্থ্য কর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য
