দরপত্র ছাড়াই এডিপির ১৮ প্রকল্পের কার্যাদেশ
আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উপজেলা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৮টি প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রচলিত বিধানে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের কথা থাকলেও ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এই প্রকল্পগুলোর জন্য কোনো দরপত্র ডাকা হয়নি। সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির কয়েক নেতা ও জনপ্রতিনিধি।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপির অতিরিক্ত চতুর্থ কিস্তিতে আলমডাঙ্গায় ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। গত ১ জুন প্রকল্পগুলো প্রাথমিকভাবে ভাগ করা হয়। পরে ১৪ জুন উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় ১৮টি প্রকল্পে র অনুমোদন দেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজের পরামর্শক্রমে প্রকল্পগুলো অনুমোদিত হয়। একই সঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রাক্কলন প্রস্তুত করে রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ ৭ ও ১৪ জুন পৃথক দুটি চিঠিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রকল্পগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন। পরে সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া সামগ্রী, বই ও বাইসাইকেল বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার সরবরাহ, বিভিন্ন ইউনিয়নে সোলার লাইট স্থাপন, রাস্তা উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ এবং একটি সেতু সংস্কারের কাজ। এসব প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এ খাতে মোট ১০টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, কৃষি, পশুসম্পদ, দুর্যোগ ও সহনশীলতা এবং বাজারজাতকরণ খাতে বাকি প্রকল্পগুলো অনুমোদন করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ পেয়েছে কালিদাসপুর এলাকার মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজ, হাউসপুর এলাকার শম্পা বিল্ডার্স, মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজ ও ঠিকাদার মো. হাফিজুর রহমান। এর মধ্যে মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজ দুটি, মো. হাফিজুর রহমান দুটি এবং মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজের নামে একটি প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি খাতের কাজ মূলত ছয়জন ঠিকাদারের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। মো. হাফিজুর রহমান নিজের নামে দুটি প্যাকেজ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী পরিচালিত মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজের নামেও একটি প্যাকেজ নিয়েছেন। একই সঙ্গে শম্পা বিল্ডার্স ও মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি কাজও তাঁর নিয়ন্ত্রণে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে হাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক বলে জানা গেছে। তবে এসব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিএনপি নেতাকর্মীর বিক্ষোভ
এদিকে দরপত্র ছাড়াই এসব প্রকল্প বরাদ্দের অভিযোগ তুলে গত সোমবার বিকেলে উপজেলা পরিষদ ও এলজিইডি কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি বিধি উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনায় প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী ও জামায়াতে ইসলামী নেতাদের যোগসাজশে এডিপির বরাদ্দের কাজ গোপনে জামায়াত সমর্থিত ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে কাজের স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির প্রভাষক শফিউল আলম বকুল সমকালকে বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা কাজগুলো পেয়েছেন। তাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। ঠিকাদার জামায়াত, বিএনপি বা অন্য যে কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন। সেটি মূল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তারাই কাজের মান যথাযথভাবে তদারক করবেন।
উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ বলেন, অর্থবছরের শেষ সময়ে বরাদ্দ পাওয়ায় সময়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। উপজেলা মাসিক সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আরএফকিউ পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনুর আক্তার বলেন, প্রকল্পের কাজ সরকারি বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন না হলে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না। অনিয়মের সুযোগও
দেওয়া হবে না।
- বিষয় :
- এডিপি
