রাখাইনে বিমান হামলা
বোমার শব্দে সীমান্তে আতঙ্ক, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা
নাফ নদে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।। ছবি-সংগৃহীত
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২১ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির জান্তা বাহিনী। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে রাখাইনের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে হওয়া হামলার রেশ এড়াতে পারেনি বাংলাদেশও। বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে সীমান্তবর্তী টেকনাফের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
নতুন পরিস্থিতিতে আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থল সীমান্তে ও নাফ নদে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, জাদিমুড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যায়। গত বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৪২ মিনিটের মধ্যে চার দফা ভারী মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দেও কেঁপে ওঠে পুরো সীমান্ত এলাকা।
ওপারের যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছে এপারের মানুষের জীবনে। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মিয়ানমারের মংডু উপজেলার হাইরিয়া পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াছ প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন। তবে তাঁর অনেক স্বজন এখনও মিয়ানমারেই বসবাস করছেন। দেশটিতে চলমান সংঘাতের খোঁজখবর তিনি নিয়মিত মোবাইল ফোনে স্বজনের কাছ থেকে নেন।
স্বজনের বরাত দিয়ে ইলিয়াছ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালেও মংডু এলাকায় গোলার বিকট শব্দ শোনা গেছে। মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডু ও বুথিডংয়ে তাদের সদরদপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব আশপাশের কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামেও পড়েছে। এতে অন্তত দুইজন রোহিঙ্গা হতাহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এ ছাড়া ২০ থেকে ৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মংডু এলাকায় এখনও হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কখন কী ঘটে, তা বলা খুবই কঠিন। কেননা গত দুই দিনে ৩০টির মতো বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।’
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, ‘এখনও রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। চলমান সংঘাতে যদি আবারও প্রাণহানি ও সহিংসতা বাড়ে, তাহলে জীবন বাঁচাতে অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।’
আতঙ্কে সীমান্তের মানুষ
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, ‘বহুদিন পর মিয়ানমারে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। এর প্রভাব টেকনাফ সীমান্তেও পড়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। অনেকে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য এমন পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগের। এভাবে চলতে থাকলে অন্যত্র চলে যেতে হবে সীমান্তবাসীদের।’
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘মিয়ানমারে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমাদের মাঝিমাল্লারা মাছ শিকারে যেতে ভয় পাচ্ছে। এ রকম হলে আমাদের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়বে।’
টহল জোরদার
সংঘাতের জের ধরে নতুন করে টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে জল-স্থলপথে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। রামুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।’
- বিষয় :
- বিমান হামলা
- টেকনাফ
