ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

নীল সাগরের তীরে মেসির নিমন্ত্রণ

নীল সাগরের তীরে মেসির নিমন্ত্রণ
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩২

বার্সেলোনা ছিল তাঁর আজীবনের প্রথম প্রেম। প্যারিস ছিল একটা দীর্ঘশ্বাস, এক যন্ত্রণাদায়ক নির্বাসন। কিন্তু এই মায়ামি? ফ্লোরিডার এই মায়াবী শহরটাই এখন লিওনেল মেসির পরম শান্তির গৃহকোণ। এই সুনীল সাগরতীরেই তাঁর সুখের নতুন ঠিকানা। এখানকার চেনা খেলার মাঠ, ছিমছাম জীবন আর প্রতিদিনের চেনা রোদ– সবকিছুকেই ভীষণ ভালোবাসায় আপন করে নিয়েছেন এই মহাতারকা।

মায়ামিও তাঁকে আগলে রেখেছে পরম মমতায়, কোনো এক রূপকথার মতো। আজ সেই চেনা উঠোনে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক জলসা বসেছে। নিজের চেনা ঘরে, নিজের সাজানো ড্রয়িংরুমে যেন উৎসবের আলো জ্বালিয়েছেন লিও। নিমন্ত্রণ করেছেন তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় নীল-সাদা পরিবারকে। মেসির মায়ামিতে আজ পরম আদরের রাজকীয় অতিথি স্বয়ং আর্জেন্টিনা!

মায়ামি মানেই লাতিন সংস্কৃতির এক উত্তাল কোলাজ, যেখানে প্রতিটি গলিতে স্প্যানিশ ভাষার চেনা টান আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় সালসা, বাচাতা কিংবা রেগেটন মিউজিকের উদ্দাম ছন্দ। আর এই শহরের খাবারের সুবাস? সে তো এক অন্য রূপকথা! মায়ামির ক্যাফেগুলোতে ধোঁয়া ওঠা কিউবান কফির কড়া সুগন্ধ আর ঐতিহ্যবাহী আর্জেন্টাইন ‘আসাদো’র (বারবিকিউ) স্বাদ যেন এই ট্রপিক্যাল স্বর্গকে আরও মায়াবী করে তোলে। আমাদের চেনা লিওনেল মেসিও মায়ামির এই স্প্যানিশ ধাঁচের সংস্কৃতি আর লাতিন আবেগের প্রেমে পড়েছেন। ইউরোপের করপোরেট ব্যস্ততা ছেড়ে মায়ামির এই চেনা সংস্কৃতির অন্দরেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের চেনা ঘরের স্বাদ। এখানকার উবার চালকরাও জানেন, এই শহরের কোন রেস্টুরেন্ট মেসির সবচেয়ে প্রিয়। মাঝেমধ্যেই তাঁকে দেখা যায় ‘কাফে প্রিমা পাস্তা’য় বসে আন্তোনেলা আর সন্তানদের নিয়ে পাস্তা কিংবা চেনা আর্জেন্টাইন মিলানেসা উপভোগ করতে। মায়ামির মিউজিক, এখানকার উৎসব আর খাবারের এই ঘরোয়া আমেজই মহাতারকাকে একদম সাধারণ একজন মানুষ হয়ে বাঁচার এক পরম স্বাধীনতা দিয়েছে।

বুধবার মাঝরাতে তিনি যখন কানসাস থেকে মায়ামি এলেন আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে, তখনও ‘দ্য ডালমার’ হোটেলের সামনে কয়েকশ আর্জেন্টাইন সমর্থকের ভিড়। তারা স্বাগত জানাতে এসে নিজেরাই যেন স্বাগত হলেন। কেননা শহরটা তো মেসিরই! অন্যান্য শহরের মতো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে আটকে নেই তিনি; বরং আছেন মায়ামির হৃদয়ে। সে কারণেই আজকের ম্যাচ দেখতে মাঠে থাকার কথা দিয়েছেন ইন্টার মায়ামির অন্যতম মালিক ডেভিড বেকহ্যাম, বাস্কেটবল কিংবদন্তি মেসির বন্ধু জিমি বাটলার। হার্ডরক স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি গ্যালারির বেশির ভাগেরই টিকিট মেসির সৌজন্যেই। আজ মায়ামিতে যেন সবাই তাঁর অতিথি।

দেখতে দেখতে মায়ামির চেনা সৈকতে কেটে গেছে প্রায় তিন-তিনটি বছর। তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে দক্ষিণ ফ্লোরিডার ফোর্ট লাউডারডেল এলাকার অত্যন্ত অভিজাত ও সুরক্ষিত গেটেড কমিউনিটি ‘বে কলোনি’ দ্বীপের একটি আলিশান ওয়াটারফ্রন্ট ম্যানশনে থাকেন। পানির কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই শান্ত দ্বীপ-শহরের বাড়িটি ইন্টার মায়ামি স্টেডিয়ামের একেবারেই কাছে। এমন একজন ফুটবলের কিংবদন্তির উপস্থিতি বাস্কেটবলের শহরে ফুটবলের উন্মাদনা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাই মায়ামির প্রশাসনও তাঁর অবদানকে কুর্নিশ জানাতে দেরি করেনি। এক জমকালো সন্ধ্যায় মায়ামির তৎকালীন মেয়র ফ্রান্সিস সুয়ারেজ স্বয়ং মেসির হাতে তুলে দেন এই শহরের সর্বোচ্চ এবং অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মান— ‘কি টু দ্য সিটি’ বা ‘শহরের প্রতীকী চাবি’। এই শহরের প্রতি তাই তাঁর দায়িত্বও আছে কিছু। যেমনটি আছে তাঁর আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে। মূলত তাঁরই ইচ্ছায় আর্জেন্টিনা দলও অনুশীলনের জন্য বেছে নিয়েছে ইন্টার মায়ামির চেনা প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। যেখানে প্রতিদিন সকালে গাড়ি থেকে নেমে ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে যান লিওনেল মেসি। গতকাল সেই চেনা ঘাসের ওপর দিয়ে যখন নীল-সাদা কিট পরে রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজরা হেঁটে যান– তখন ইন্টার মায়ামির চেনা উঠোনটাই যেন হয়ে যায় এক টুকরো বুয়েনস এইরেস!

বিকেলের তপ্ত রোদে যখন স্কালোনি তাঁর ছেলেদের নিয়ে ট্যাকটিক্যাল বোর্ডে মাথা নিচু করে নকআউটের স্ট্র্যাটেজি বোঝান– ঠিক তখনই প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের চারপাশে তৈরি হয় এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনা। এ কোনো সাধারণ প্র্যাকটিস সেশন নয়; দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক উৎসবের মহড়া। ফেন্সিংয়ের বাইরে তখন মানুষের ভিড়। ড্রামের অবিরাম আওয়াজ। আর বাতাসে ভাসছে সেই চেনা চ্যান্ট– ‘মুচাচোস...।’

মায়ামির বুকে যে এত আর্জেন্টাইন ভক্ত লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো স্বয়ং মেসিও আগে টের পাননি! ফ্যানদের চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি। তাদের প্রিয় জাদুকরের ঘরে এসে তারা আজ জাদুকরের নিজের দলকেই চিৎকার করে সমর্থন জোগাচ্ছে। নিমন্ত্রণকর্তা মেসি আজ তৃপ্ত। নিজের ঘরে, নিজের চেনা ভালোবাসার মানুষের মধ্যে তাঁর দল আজ বিশ্বকাপের ট্রফি ধরে রাখার লড়াইয়ের জন্য ধারালো করে নিচ্ছে নিজেদের অস্ত্র। মায়ামির মায়াবী বিকেলে নিজের মাঠে দাঁড়িয়ে মেসি আজ প্রস্তুত তাঁর প্রিয় আর্জেন্টিনার হাত ধরে নতুন কোনো ইতিহাস লিখতে।

আরও পড়ুন

×