ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

করোনাভাইরাস

আশার আলো দেখতে চাই

আশার আলো দেখতে চাই
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০ | ১২:১২

গত ১০০ বছরে কোনো মহামারি করোনাভাইরাসের মতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেনি। আতঙ্ক এখন এক ধরনের মানসিক অবসাদে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জনগণ প্রতিমুহূর্তে অন্যের সান্নিধ্য প্রয়াসী, সেখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাজটি খুবই কঠিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকার নানা নির্দেশনা দিলেও মানুষের ভিড় কমানো যাচ্ছে না। দলবেঁধে গ্রামের বাড়ি যাওয়া থেকে কাউকে থামানো যায়নি। সম্প্রতি লাখখানেক লোক সদরঘাট টার্মিনালে দেশে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে। স্থলপথে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য হাজার হাজার মানুষ ঈদের মতো বিভিন্ন যানবাহনে চেপে রীতিমতো যানজটের সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় সংক্রমণ যে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। তবুও মানুষ ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে নিজ গ্রামাঞ্চলে চলে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায়। প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও তাই। সুদূর প্রবাস থেকে যে কোনো উপায়ে দেশে ফিরে এসে তারা মুক্তির আশা খুঁজছেন। সেই সঙ্গে করোনা সংক্রমণও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।
সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিমানবন্দরে কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাই ছিল না। যখন ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে, তখন তাদের নিয়ে আসা হয় আশকোনার হাজী ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে বস্তুত আগে থেকে কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি। তাই যাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো, তারা রীতিমতো বিদ্রোহ শুরু করে দিল। কারণ খুবই যুক্তিসঙ্গত। সেখানে খাবার নেই, পানির ব্যবস্থা নেই, টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। বিছানাপত্র তো পরের বিষয়। হাসপাতালগুলোতেও কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। চিকিৎসক-নার্সদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও একেবারেই বিবেচনা করা হয়নি। ফলে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে কোথাও কোথাও কর্মবিরতি পালন করছেন।
মিডিয়ার মাধ্যমে ভয়ংকর সব দুঃসংবাদ প্রচার হওয়ার পর জনগণ আতঙ্কিত এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে একমাত্র আনন্দের সংবাদ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। হুটহাট করে সব জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অতি প্রাচীন প্রবণতা। বাংলাদেশে যখন কোনো ধর্মীয় উৎসব আসে, বিশেষ করে রোজা, ঈদ বা পূজা, সে সময়গুলোতে দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যায়। মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে কিছু ম্যাজিস্ট্রেট বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেন; কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না। বাবুবাজারের ব্যবসায়ীদের জরিমানা করলে চাঁদপুর, বগুড়া ও দিনাজপুরের ব্যবসায়ীদের কিছু আসে যায় না। কারওয়ানবাজারে খুচরা দোকানদারদের জরিমানা করলেও একই ব্যাপার ঘটে। বাংলাদেশে শিশুখাদ্য ও ওষুধে ভেজাল দেওয়া কোনো নতুন কথা নয়। এখানেও ম্যাজিস্ট্রেটরা জরিমানা করেন; কিন্তু তার প্রতিফলন নেতিবাচকই হয়। হাজার বছর আগে ইবনে বতুতা অথবা হিউয়েন সাঙ ভেজাল খাবার খেয়ে এই বাংলাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা এর মধ্যেও তৎপর। এর মধ্যেও তারা ব্যবসাটা করে যাচ্ছেন। কতটুকু অনৈতিক হলে এটা সম্ভব? সরকার বারবার এক কথা বলছে- দেশে প্রচুর খাদ্য মজুদ আছে, কারও বেশি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মন্ত্রী ও সাংসদরা বাদশা হারুনুর রশিদের মতো ছদ্মবেশে বাজারে গিয়ে দেখেন না মজুদ থাকলেও দ্রব্যমূল্য কমছে না। পশ্চিমবঙ্গে দেখেছি- মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়করা নিয়মিত বাজার করেন। কিন্তু এ দেশে ছোট একজন নেতাকেও বাজারে যেতে হয় না। তাদের জন্য বাজার আসে। কেউ কেউ একবার মন্ত্রী হতে পারলে দেশের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট চাল, ডাল, মাছ, মাংস বিনামূল্যে দীর্ঘদিন খেতে পারেন। মন্ত্রী না থাকলেও এদের কোনো অসুবিধা হয় না। কোনো কোনো মন্ত্রী বা মেয়র অফিসে বসে যখন মধ্যাহ্নভোজ করেন, তখন তিনি তার সাঙ্গপাঙ্গোদের নিয়েই বসেন। আর এসব খাবারের জোগান আসে সাঙ্গপাঙ্গোদের কাছ থেকেই। এ ক্ষেত্রে আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন সবাই যুক্ত হন এই প্রক্রিয়ায়। যা হোক, এ সমস্যা সাধারণের কাছে অনেক বড়; কিন্তু শাসকদের কাছে কিছুই নয়।
এবার একটু দেখা যাক মিডিয়াকর্মীদের বিষয়। যখন দেশে কোনো দুর্যোগ আসে, তখন সংবাদ পরিবেশনের ধারাটাও হয়ে যায় একপেশে। মানুষকে দুর্দিনে সাহস দেওয়ার কোনো বিষয়ই থাকে না। এখন এই মিডিয়ার সংবাদকর্মীদের সঙ্গে ফেসবুক। অহরহ নানা ধরনের দুঃসংবাদ দিয়ে মানুষকে ভীত করে তুলছে। সুসংবাদ কোনো সংবাদ নয়, দুঃসংবাদই সংবাদ- এই সংবাদবিজ্ঞানকে অনুসরণ করে চলছেন তারা। একবার ভারতের একজন বিখ্যাত সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কলকাতায় কথা বলছিলাম। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের কথা বলতে গিয়ে একসময় উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন- সোভিয়েত ইউনিয়ন আমরা ভেঙেছি, না হলে আমাদের সারাবিশ্বের সংবাদপত্রগুলো বন্ধ হয়ে যেত। আমি একটু হাসছিলাম। কিন্তু তিনি আরও জোর দিয়ে বললেন, উপায় কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে কোনো সংবাদ নেই। ব্যানার হেডলাইনের জন্য কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর আমাদের সে সুযোগ এসে গেল। পত্রিকার কাটতি বেড়ে গেল কয়েকগুণ। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নতুন জোয়ার এলো।
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের জন্য অবশ্যই সত্যকে তুলে ধরতে হবে। সত্য কখনও বড়ই কঠিন, বড়ই নিষ্ঠুর। কিন্তু সব সংবাদের মধ্যেই যেমন দুঃসংবাদ থাকে, তেমনি সুসংবাদও যে ছিটেফোঁটা থাকে না তা নয়। যেমন কিউবা থেকে ৫২ জন স্বাস্থ্যকর্মী ইতালিতে এসে পৌঁছেছেন। তারা নিজের দেশের করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করে নিজেদের মালিকানায় না রেখে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। যেহেতু কিউবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু, তাই এই সংবাদ খুব বেশি প্রচার করা যাবে না। এই সংবাদ ব্যানার হেডলাইন হবে না। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে কোনো বড় দেশ যদি ছোটখাটো কোনো আশার আলো দেখাতে পারত, তাহলে ব্যানার হেডলাইন হতে কোনো আপত্তি থাকত না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও এই সংবাদ প্রচারিত হতো।
একশ' বছর আগের পৃথিবী এখন আর নেই। বিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, প্রচুর নোবেল বিজয়ী রয়েছেন ঔষধ শিল্পে নতুন উদ্ভাবনের জন্য। তাই খোদ আমেরিকাতেও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেল লেভিট বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শক্তি কমে আসছে। এটাও মানব জাতির জন্য একটা সুসংবাদ। আমরা প্রতিমুহূর্তে সুসংবাদপ্রত্যাশী। কারণ, আমাদের দেশে ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী আছে, যারা আকাশের নিচে বসবাস করে, দিন আনে দিন খায়। সামাজিক দূরত্ব তৈরি হলে তাদের নিত্যদিন উপোস থাকতে হবে। উন্নত বিশ্বে প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্র অর্থ সহযোগিতা দেবে। আমেরিকা, কানাডা, চীন, জাপানসহ অনেক দেশই বিত্তহীন মানুষকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেছে। কিন্তু আমাদের সে অর্থ নেই এবং বণ্টনের ব্যবস্থাও নেই। দ্রুত বণ্টন করতে চাইলেও রিলিফের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এ ক্ষেত্রেও তাই হবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- চাটার দল সব চেটে খেয়ে নেবে।
দেশের সংকট বিবেচনায় সেনাবাহিনী নেমেছে। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে বাজারদর এবং মানুষের চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু সে খুবই সাময়িক। সংকট কেটে গেলে সেনাবাহিনী চলে যাবে আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাবে সবকিছু। তাই সেনাবাহিনীকে নামানো কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। যেহেতু এটা সেনাশাসন নয়, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে দূরত্বে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সিভিল প্রশাসনকে বেশি সক্রিয় রাখা দরকার। কারণ, ইতোমধ্যেই কিছু ব্যক্তি রাজনীতির ছত্রছায়ায় যথেচ্ছাচার করে দলকে নানাভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। বর্তমান সংকট কঠিন। কিন্তু আশা করি, করোনাভাইরাসও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং মানুষ তার কর্মজীবনে ফিরে আসবে। মাঝখানের সময়টুকুতে রাষ্ট্র যথাসাধ্য কল্যাণকর ব্যবস্থার আয়োজন করবে, এই কামনা করি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×