ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের উদ্দেশ্য কী

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের উদ্দেশ্য কী
×

ড. আকমল হোসেন

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৪

১২ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে পাস হওয়া নাগরিকত্ব আইন ( সিএএ) নিয়ে ভারতজুড়ে তুমুল বিক্ষোভ হচ্ছে। আগের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী হিসেবে নতুন আইন করা হয়েছে। এ আইন নিয়ে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলে তাদের ওপর পুলিশ যে নির্যাতন চালিয়েছে, তার প্রতিবাদে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বেঙ্গালুরু, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হিসাবে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটি আরও বেশি। সংখ্যা যাই হোক না কেন, সমগ্র ভারতের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে সচেতন এ গোষ্ঠীর ক্ষোভের প্রকাশ পেয়েছে। জামিয়া মিলিয়ার অঙ্গনে প্রবেশ করে গ্রন্থাগারে পাঠরত এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যাশায়ীদের ওপর পুলিশের হামলার কথা জেনে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। মিলিয়ার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিদেশেও শিক্ষার্থীদের সংহতি সমাবেশ করার খবর পাওয়া গেছে।


ভারতের রাজধানী দিল্লি, মণিপুর, মেঘালয়, আসাম, কর্ণাটক, বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে সাধারণ মানুষও এর প্রতিবাদ করছে। কোথাও কোথাও প্রতিবাদ সহিংস হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মুখে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার ঘটনাও ঘটছে। সংশোধনী বিলটি পাসের পরপরই প্রথম আসামে প্রতিবাদ হয়েছে। ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বলবৎ হলে ফল হিসেবে আসামকেই প্রথম এর দায় নিতে হবে। ইতোমধ্যে এখানে যে নাগরিকপঞ্জি করা হয়েছে, তার বাইরে থাকা বিপুল বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ভারতের নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া হবে, যা অসমীয়রা চায় না। তাদের নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখার জন্য এ আইন গত শতাব্দীর আশির দশকে অসমীয়দের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের করা চুক্তির বিরোধী হবে বলে তারা মনে করে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএমসহ রাজ্যস্তরে ক্ষমতাসীন কিছু দল সিএএর বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ করছে। তবে মুম্বাইয়ে ক্ষমতাসীন শিবসেনা দলটি লোকসভায় বিলের সমর্থনে ভোট দিলেও রাজ্যসভায় বিলের পক্ষে ভোটদানে বিরত থেকেছে। অন্যদিকে অসম গণপরিষদ, বিজেডি ও জেডেইউ আগে সমর্থন করলেও নিজ নিজ রাজ্যে প্রতিবাদের আঁচ পেয়ে তাদের অবস্থান রাতারাতি পাল্টে ফেলেছে। এদের মধ্যে শিবসেনার অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের জোট মন্ত্রিসভার অন্যতম মিত্র কংগ্রেসের চাপ ভূমিকা রাখতে পারে, বলা হচ্ছে। এর মধ্যে বিক্ষোভরতদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোয় ২৫ জন নিহত হয়েছে। এ ব্যাপারে অমিত শাহ যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা সবসময় ক্ষমতাসীনদের দিতে দেখা যায় :রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জানমাল রক্ষার জন্য পুলিশের পক্ষে এর ভিন্ন কিছু করার ছিল না।

এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিবাদ চোখে পড়ার মতো। পরপর তিন দিন এর দলীয় প্রধান ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং সামনে থেকে দীর্ঘ মিছিল করেছেন। রাজ্যের হাওড়া-মুর্শিদাবাদে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ভারতজুড়ে মুসলমান সমাজ এ আইনের বিরুদ্ধে সরব বলে মনে হয়। তারা মনে করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনকে ব্যবহার করা হবে এবং তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে।

সিএএ অনুসারে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতের বুকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে 'নির্যাতিত' হয়ে যেসব হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন ও পারসি সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় নিয়েছে, তাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। এর আগে নাগরিকত্বের জন্য নূ্যনতম ১১ বছর ভারতে বসবাসের শর্ত ছিল, যা বর্তমান আইনে ছয় বছর করা হয়েছে। এসব মানুষকে একটা এফিডেভিট দিয়ে নাগরিকত্বের আবেদন করতে হবে। অন্যদিকে নাগরিকপঞ্জি চূড়ান্ত করা আসামে অবৈধ বলে বিবেচিতদের নাগরিকত্বের সপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে। ইতোমধ্যে সে রাজ্যে ১৯ লাখ, যার সিংহভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকপঞ্জির মানদণ্ড উতরাতে পারেনি; তাদের জন্য সিএএ আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। কেন্দ্রের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুযায়ী সমগ্র ভারতে এখন নাগরিকপঞ্জি করতে চায়, যাতে স্থিরকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী অবৈধদের চিহ্নিত করা যায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনটি কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়নি। মুসলমানরা এর শিকার হবে না। কিন্তু এর বিরোধীরা তাতে আশ্বস্ত হতে পারছে না।

মুসলমানদের মধ্যে যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করছে তাদের কথা- নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব আইন পাশাপাশি রেখে তাদের সম্প্রদায়ের লোকজনকে নিশানা বানানো হবে। তাদের কথা, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিক হতে পারবে সহজেই আর মুসলমান সম্প্রদায়ের বিপুল অধিকাংশ মানুষের পক্ষে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কোনো কাগজ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। তখন তারাই এ আইনের বলি হবে। যেমন, ব্রিটিশ আমলে ও তার পরে যেসব মানুষ বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে আসামে গেছে, তারা দরিদ্র কৃষিজীবী ছিল। কোনো কাগজপত্রের অপেক্ষায় না থেকেই তারা বসতি নিয়ে তাদের কৃষিবৃত্তি শুরু করেছিল। এদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ছিল। এখন নাগরিক আইন অনুযায়ী হিন্দুরা নাগরিক হয়ে যাবে; কিন্তু মুসলমানদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে না। অবশ্য মুসলমান ছাড়া নাগরিকপঞ্জির বাইরে থাকা গোর্খাসহ অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যও সিএএকে ব্যবহার করা হবে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন।

আসামের পর ভারতের অন্য রাজ্যগুলোয় নাগরিকপঞ্জি করার পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপি সরকারের। তাদের নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, নাগরিকপঞ্জি করা হলে কারা অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাবে। মুসলমানদের আশঙ্কা, তাদের এর বাইরে রেখে তাদেরকে চৌদ্দপুরুষের ভিটা থেকে উৎখাত করা হতে পারে।

বিজেপির নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকেন যে- বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ায় এসব দেশে সংখ্যালঘু ছয় সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। বছর বছর তারা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এসব মানুষ অত্যাচারিত হয়ে ভারতকে তাদের আশ্রয়স্থল বলে মনে করে। তবে পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তান যেহেতু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তাই মুসলমানদের নির্যাতিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তাদের প্রশ্ন- নাগরিকপঞ্জিতে চিহ্নিত এ সম্প্রদায়ের মানুষ তাহলে কেন ভারতে থাকবে? তবে ভারতের যেসব রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মী এ আইনের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন তাদের বক্তব্য, এটি ভারতের সংবিধানের পরিপন্থি; যেখানে সব ধর্মীয় সম্প্রদায় বা জাতিকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আইনটি ভারতকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে। ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

যারা এ আইনের বিরোধিতা করছেন তাদের মধ্যে যেমন মুসলমানরা আছে; আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও। বরং তারাই সংখ্যার বিচারে বড় আকারের হবে। সুতরাং এর বিরোধিতাকে সাম্প্রদায়িক চিন্তার ফসল বলা যায় না। প্রতিবাদের সময় সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে এ আইনের বিরোধীদের সমালোচনা করতে গিয়ে বিজেপি নেতারা যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তাতে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। টেলিভিশন টকশোতে তাদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে, এসব সহিংসতার পেছনে 'লুঙ্গিওয়ালাদের দল' দায়ী। তারা বলছেন যে পরিধেয় দিয়ে কারা এসব করছে তাদের চেনা যায়। এখন লুঙ্গিওয়ালা বলতে যদি মুসলমানকে বোঝানো হয়, তাহলে বিষয়টি খণ্ডিত ও সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বলতে হবে। প্রতিবাদকারীরা যে শুধু মুসলমান নয়, বরং অধিকতর সংখ্যক অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত, তাহলে তাদের পরিধেয় কি লুঙ্গি ছিল?

তারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যে চিত্র আঁকছেন তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারছেন না। তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা যেভাবে ঘটছে তাতে এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের অস্তিত্বের সংকটে আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শুধুই মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার কারণে দেশ ছাড়ছে- এমন অভিযোগের ঐতিহাসিক সত্যতা আছে বলে মনে হয় না। এভাবে ঢালাও অভিযোগ তুলে তারা হয়তো নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করতে চান; কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা বোঝেন কি? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুদিন আগে ভারতের শাসকদের অভিযোগ অমূলক বলেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের মন্ত্রী ও কর্মকর্তা পর্যায়ের কয়েকটি বৈঠক স্থগিত হয়ে গেছে। সুতরাং প্রকাশ্যে সিএএ এবং এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বললেও এ থেকে উৎপন্ন হওয়া উত্তাপ বাংলাদেশ ঠিকই টের পাচ্ছে।

সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদির বিশ্নেষক



আরও পড়ুন

×