করোনা-সংকট
বাজার যেন বাগড়া না দেয়
--
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৩০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১২:১৭
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশে আরও নানা সংকটের মতো বাজারও যে বাগড়া দিতে পারে, এমন আশঙ্কা আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই নিকট অতীতে একাধিকবার প্রকাশ করেছি। বিশেষত 'লকডাউন' চলাকালে পরিবহন সংকটের কারণে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে, তা বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বব্যাপীই ইতোমধ্যে প্রমাণিত। সোমবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমাদের সেই আশঙ্কারই প্রতিধ্বনি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা আশঙ্কা করি, করোনার আঘাতে এমনিতেই জেরবার নাগরিকদের জন্য বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে আসছে বাজার পরিস্থিতি। অর্থনৈতিক তৎপরতা প্রায় সম্পূর্ণ স্থবির হওয়ার পর যেখানে মানুষের আয় সীমিত বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে পড়েছে, সেখানে বাজারের চড়া মূল্য তাদের আরও নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে। সামান্য সঞ্চয় দিয়ে দুঃসময় পাড়ি দেওয়ার যে কাচের দেয়ালের ভরসা, তাও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
অস্বীকার করা যাবে না- আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থা এমনিতেই সদা চঞ্চল; স্থিতিশীল রাখতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। এ নিয়ে নাগরিকদের থাকে বাড়তি অথচ প্রায় সাংবৎসরিক উদ্বেগ। আজ পেঁয়াজ তো কাল লবণ, পরশু চাল তো তরশু চিনির দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর ওঠানামা করতেই পারে; তার পেছনে চাহিদা ও সরবরাহের ধ্রুপদি কারণও থাকে সাধারণত। কিন্তু আমাদের দেশে এমন নজির কম নেই যে, দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর অদৃশ্য কারণগুলোও আমাদের অজানা নয়। এর নেপথ্যের কুশীলবরাও আমাদের অচেনা নয়। বস্তুত নাগরিকদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সোমবার সমকালে প্রকাশিত আলোচ্য প্রতিবেদনের বিশেষত্ব হচ্ছে, এই আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে খোদ বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) পক্ষ থেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রেরিত এক প্রতিবেদনে সরকারি সংস্থাটি বলছে, গত এক মাসে স্থানীয় বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মসুর ডাল, আদা, দেশি রসুন ও পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
আমরা মনে করি, করোনাকালে বাজার ব্যবস্থাপনার দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, দেশীয় উৎপাদনের বাজারজাতকরণ বন্ধ করা যাবে না। কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে পণ্য উৎপাদন করছে, তা যদি বাজারে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে এই দুঃসময় তাদের জন্য হয়ে উঠবে আরও অসহনীয়। দুর্ভাগ্যবশত, লকডাউন পরিস্থিতিতে দেশের অনেক এলাকায় আন্তঃজেলা যোগাযোগ পর্যন্ত বন্ধ থাকায় কৃষিপণ্য চলাচল করতে পারছে না। এমনকি বিভিন্ন জনপদে 'সামাজিক দূরত্ব' রক্ষার তাগিদে স্থানীয় পর্যায়ের হাট-বাজারগুলোতে সীমিত বেচাকেনা আরও সীমিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতেই হবে। অন্যথায় উৎপাদকরা যেমন পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ হারাবে, তেমনই স্থানীয় পর্যায়ের ভোক্তারাও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাবে না। মাছ ও সবজিসহ কিছু কাঁচামাল যথাসময়ে বাজারে পৌঁছাতে না পারলে সেগুলো পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ষোলোআনা। ইতোমধ্যে আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে এ ধরনের খবর পেয়েছি। এমন পরিস্থিতির পরিণতি যে কোনো দিকেই ধাবিত হতে পারে, মনে রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতেই হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যদিও নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে; প্রান্তিক পর্যায়ে তা কতখানি প্রতিপালিত হচ্ছে, আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য, সড়ক পরিবহন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দিতে চাই আমরা।
দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। খাদ্যশস্য, মাছ, সবজির মতো কিছু পণ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও আরও অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমরা আমদানিনির্ভর। কয়েকদিন আগে সমকালেই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবাহী জাহাজ 'ভিড়' করে আছে; কিন্তু খালাসের গতি শ্নথ। আমরা দেখতে চাইব, অবিলম্বে পণ্য খালাসের গতি বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে পণ্য পরিবহন মসৃণ করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, পণ্য পরিবহনের 'লাইফলাইন' যদি আমরা সচল ও সক্রিয় রাখতে না পারি, তাহলে করোনা মোকাবিলা হয়ে পড়বে আরও কঠিন।
আমরা চাই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু নয়- সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিটিটিসি প্রেরিত প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। বাজার ব্যবস্থা সচল রাখতে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাত্মক ব্যবস্থাও নিতে হবে এখনই। এ ক্ষেত্রে সামান্য বিলম্ব অসামান্য সংকট তৈরি করতে পারে। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, সামনে রমজান মাস। এই মাসে নিত্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি উপলক্ষ করে একটি শ্রেণি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতিবছর। এবার তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। করোনা-সংকট মোকাবিলায় বরং থাকতে হবে দ্বিগুণ সতর্কতা ও ত্রিগুণ সক্রিয়তা।
