প্রকৃতি ও অর্থনীতি দুই-ই বাঁচুক
শেখ নাহিদ নিয়াজী
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৩০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১২:১৯
দমবন্ধ ঢাকা শহরে এমন নির্মল বাতাস জীবনে উপভোগ করিনি। আজকাল সকাল ১১টায় ঘুম থেকে উঠলেও বারান্দায় দু-একটা পাখি দেখা যায়। পাখির কিচিরমিচির শুনি সকালে এবং সন্ধ্যায়। বাইরে গাছপালার দিকে তাকালে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। এবার এপ্রিল মাসেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) ছাড়াই রাতে ঘুমাই। একদম গরম লাগে না। তাপমাত্রা খুব সহনীয় অবস্থায় আছে। বাতাসে দূষণ একেবারে কমে গেছে। দারুণ আবহাওয়া। শব্দদূষণও নেই একদম। আমরা প্রকৃতির অংশ। কিন্তু সেটা ভুলে গিয়ে প্রকৃতি ধ্বংস করে, গাছপালা কেটে, নদীনালা ভরাট করেছি। আর এর নাম দিয়েছি সভ্যতা।
নিশ্চয় অনেকেরই নানারকম উপলব্ধি হয়েছে এই কয়েক সপ্তাহ ঘরে অবরুদ্ধ থেকে। অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করার সময় পাচ্ছি আমরা। অফুরন্ত সময়। আমি কিন্তু এখনও একটু অস্থির বা বিরক্ত হইনি। ভালোই যাচ্ছে অবরুদ্ধ জীবন। ঘুম, খাওয়া, ঘরের মধ্যে ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা, বই পড়া, মাঝেমধ্যে আমার ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো (অনলাইন পড়ালেখা), ছেলেকে পড়ানো, টেলিভিশনে খবর দেখা। পত্রিকা পড়া, চলচ্চিত্র বা সিনেমা দেখা, গান শোনা, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, স্রেফ চিন্তা করা, অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা বলা, ফেসবুকিং করা, মেসেঞ্জারে চ্যাট করা এবং অ্যালবাম ঘেঁটে পুরোনো দিনের ছবি দেখা। আজকাল বাংলাদেশ টেলিভিশনে বহুব্রীহি নাটক দেখছি রাত ৯টায়। অসাধারণ নাটক। মধ্যবিত্ত সেই জীবন এখনও চোখে লেগে আছে। এই তো সেদিন সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র হীরক রাজার দেশে আরেকবার দেখলাম। দারুণ সিনেমা! এখনও প্রাসঙ্গিক! কিন্তু এত সবের পর দুশ্চিন্তাও আছে। খবরে প্রতিদিন দেখছি, অনেক দিনমজুর শ্রেণির মানুষ ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না। অনেকে এখনও অফিস থেকে বেতন পায়নি গত মাসের। কারও সঙ্গে এগুলো বলতেও পারছে না। সাহায্যও নিতে পারছে না। সরকার বলছে সাধারণ ছুটি। ঘরে থাকুন। গরিব মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মাফিক সহায়তা মিলছে না।
এই ভোগবাদী, অশুভ ও অমানবিক সমাজ ভাঙতে হবে। এর পুরোটাই যেন কৃত্রিম। এর উন্নয়ন- সেটাও কৃত্রিম ও ফাঁপা। কারণ এটি পরিবেশবান্ধব নয়। তাই এটি টেকসইও নয়। আসলে একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের সূচক হতে হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান এবং নাগরিক অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হয় তার ওপর। আমাদের সরকারগুলো 'মানসম্মত শিক্ষা এবং ভালো মানের স্বাস্থ্যসেবা' নিয়ে কখনও ভাবেনি, এমন অভিযোগ কম নয়। যারা সরকারে থাকেন বা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন বা থেকেছেন, তারা এ দুটি জিনিস বা সেবা বিদেশ থেকে কিনে থাকেন। সেটাই হচ্ছে দুর্গতি! আর এখন তার ফল ভোগ করছি আমরা সবাই। করোনাভাইরাস আমাদের নিশ্চয়ই সত্যিকারের দায়িত্ববান নাগরিক হতে সাহায্য করবে। এই মহামারি আমাদের প্রকৃতিকে অনেক গুরুত্ব দিতে শেখাবে এবং পরিবেশ ধ্বংস করে আর কোনো বেহুদা উন্নয়ন যাতে না হয়- এ ব্যাপারে আরও বেশি সোচ্চার ও সচেতন হতে শেখাবে। তারপরও সরকার যারা পরিচালনা করবেন তাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি, কারণ ব্যবস্থাপনার চাবি তাদের হাতে। আমরা করোনার শিক্ষা ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাই। আমাদের সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা এখনই জরুরি। যেমন- প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স), রপ্তানি আয় (গার্মেন্টস), কৃষি খাতে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা তাদের বেতনের ৩০ শতাংশ কম নেবেন পুরো বছর ধরে। বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিরা কী ভাবছেন? কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ান এবং কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনা দিন, যাতে করে দেশে কোনো খাদ্য সংকট না হয়। উপসচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ির (জ্বালানি খরচ বাবদ অর্থ) ব্যয় হ্রাস করুন। অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল সেক্টর) খাতে প্রণোদনা যাতে ঠিকঠাক মতো যায়, তার সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করুন। বেশ কিছু আনুষ্ঠানিক খাতে (ফরমাল সেক্টর) যেমন : বেসরকারি খাতের বিশ্ববিদ্যালয়, ট্যুরিজম, এয়ারলাইন্স ও অন্যান্য খাতে যথেষ্ট পরিমাণে আর্থিক প্রণোদনা দিন। সব ধরনের আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নিন। প্রবাসী শ্রমিকরা যাতে চাকরি না হারায় তার জন্য জরুরি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন।
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected]
